আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্চ ১৩, ২০২৬, ০৩:২০ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন মৃত্যু আর বারুদের গন্ধে ভারী। ইরান ও লেবাননভিত্তিক হিজবুল্লাহর যৌথ আক্রমণে উত্তর ইসরায়েলের জনপদ যখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে, ঠিক তখনই বিশ্ব অর্থনীতিকে খাদের কিনারা থেকে বাঁচাতে এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন।
গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা ইরান, ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে যে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলা করতে রাশিয়ার তেলের ওপর থেকে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
শুক্রবার ভোরে উত্তর ইসরায়েলের জারজির শহরে ইরানের ছোড়া একটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি আঘাত হানে। ইসরায়েলের ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ বিভাগ জানিয়েছে, একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্রটি আছড়ে পড়ার পর সেখানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে।
ইসরায়েলি জরুরি সেবা সংস্থা মাগেন ডেভিড অ্যাডম জানিয়েছে, এই হামলায় অন্তত ৫৮ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরী এবং ৩৪ বছর বয়সী এক নারী রয়েছেন যার অবস্থা আশঙ্কাজনক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ফুটেজে দেখা গেছে, জারজির শহরের রাস্তায় দুমড়েমুচড়ে যাওয়া গাড়ি এবং ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সাইরেন বাজার পর তারা ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্রটি শনাক্ত করলেও জনাকীর্ণ এলাকায় আঘাত হানা ঠেকাতে পারেনি।
ইরান যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এক চাঞ্চল্যকর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত করেছে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এই পদক্ষেপকে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মূলত ইরানের তৈরি করা অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা মোকাবিলা করতেই শত্রুদেশ রাশিয়ার তেলের ওপর এই শিথিলতা আনা হয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিজস্ব রিজার্ভ থেকে ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৪০ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দেয়।
ইরান সীমান্তের মাত্র ১১৫ কিলোমিটার পশ্চিমে ইরাকের ইরবিল অঞ্চলে এক ভয়াবহ ড্রোন হামলায় ফ্রান্সের সামরিক বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ নিশ্চিত করেছেন যে, হামলায় একজন ফরাসি সেনা নিহত এবং আরও অন্তত ছয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
কুর্দিস্তানে মোতায়েন করা এই ফরাসি সেনারা মূলত ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইরত একটি আন্তর্জাতিক জোটের অংশ হিসেবে সেখানে অবস্থান করছিলেন। মাখোঁ এই হামলাকে অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন। ড্রোনটি ইরান থেকে এসেছে নাকি ইরান সমর্থিত কোনো গোষ্ঠী এটি পাঠিয়েছে, তা নিয়ে তদন্ত চলছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে নতুন দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে। একই সময় দক্ষিণ লেবানন থেকে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারাও ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলে একযোগে রকেট ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে।
তেহরানের মূল লক্ষ্য এখন ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা আয়রন ডোমকে পুরোপুরি অকেজো করে দেওয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করা। রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কার্যত স্বীকার করে নিল যে, ইরানের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি চরম ঝুঁকির মুখে।
একদিকে যেমন লেবানন ও ইসরায়েল সীমান্তে লাশের মিছিল বাড়ছে, অন্যদিকে পর্দার আড়ালে চলছে বৃহৎ শক্তিগুলোর তেলের রাজনীতি। হরমুজ প্রণালি কতদিন বন্ধ থাকবে এবং তেলের এই কৃত্রিম সরবরাহ সংকট বিশ্বকে কত বড় মন্দার দিকে ঠেলে দেবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
জেএইচআর