আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জুন ১, ২০২৬, ০৩:০৭ পিএম
হরমুজ প্রণালীতে কয়েক মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলার মাঝেই নতুন করে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত সপ্তাহান্তে ইরানের বেশ কয়েকটি সামরিক ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালিয়েছে।
এর জবাবে ইরানও অঞ্চলের একটি মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করার দাবি করেছে, যা গত এক সপ্তাহের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো বড় ধরনের সংঘাতের রূপ নিল। এই উত্তেজনার মধ্যেই উপসাগরীয় দেশ কুয়েত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একাধিক 'শত্রুভাবাপন্ন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা' প্রতিহত করছে।
ওযর-আপত্তির লড়াই, হামলা ও পাল্টা হামলা
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা ইরানের 'আক্রমণাত্মক পদক্ষেপের' জবাবে এই 'আত্মরক্ষামূলক হামলা' চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, আন্তর্জাতিক আকাশসীমায় তাদের একটি এমকিউ-১ ড্রোন ইরান কর্তৃক গুলি করে ভূপাতিত করার পর তারা এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।
সেন্টকমের বিবৃতি অনুযায়ী, শনিবার ও রবিবার ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলের গুরুক শহর এবং হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত কিশম দ্বীপে ইরানি সামরিক বাহিনীর রাডার ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ড্রোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে সুনির্দিষ্ট হামলা চালানো হয়েছে। এই অভিযানে কোনো মার্কিন সেনা বা কর্মী হতাহত হয়নি।
অন্যদিকে, ইরানের শক্তিশালী আধাসামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলার মূল উৎস হিসেবে ব্যবহৃত একটি বিমান ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।
আইআরজিসির মতে, পারস্য উপসাগরের সিরি দ্বীপের একটি যোগাযোগ টাওয়ারে মার্কিন হামলার জবাবে তারা এই প্রতিশোধমূলক আক্রমণ চালায়। ইরানের আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সির বরাতে জানা গেছে, দেশটির সামরিক বাহিনী সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ ধরনের আগ্রাসনের পুনরাবৃত্তি হলে ইরানের পরবর্তী জবাব হবে 'সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং আরও কঠোর।
আতঙ্কের মুখে কুয়েত
মার্কিন ঘাঁটির স্বাগতিক দেশ কুয়েত সোমবার ভোরে দেশজুড়ে বিমান হামলার সাইরেন বাজিয়ে সতর্কবার্তা জারি করে। দেশটির সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে যে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আক্রমণ মোকাবিলা করছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কুনা জানিয়েছে, কুয়েতের আকাশসীমায় বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, যা মূলত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কারণেই ঘটেছে।
যদিও কুয়েতি প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার জন্য সরাসরি ইরানকে দায়ী করেনি, তবে এর আগের সপ্তাহেও মার্কিন হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে কুয়েতের একটি বিমান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজ প্রণালীর গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ইরানের মাইন স্থাপন এবং বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণ ঠেকানোর জন্য তারা কুয়েতের ঘাঁটি ব্যবহার করে আসছিল, যার ফলেই কুয়েত ইরানের মূল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।
ট্রাম্পের ব্যবসায়িক কৌশল ও যুদ্ধবিরতির অনিশ্চয়তা
এই তীব্র সামরিক উত্তেজনার মাঝেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার ভোরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ তার সমালোচকদের শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। ট্রাম্প তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে লিখেছেন, সবাই একটু আরাম করে বসুন এবং পরিস্থিতি দেখুন। শেষ পর্যন্ত সবকিছু খুব ভালোভাবেই সমাধান হবে। ইরান আসলে একটি চুক্তি করতে খুবই আগ্রহী, এবং এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি চমৎকার চুক্তি হতে যাচ্ছে।
তবে বাস্তব চিত্র ট্রাম্পের আশাবাদের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। গত এপ্রিল মাসের ৮ তারিখ থেকে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও স্থায়ী শান্তির পথ এখনো অবরুদ্ধ। গত শুক্রবার হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ও তার শীর্ষ উপদেষ্টাদের মধ্যে একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি চূড়ান্ত করার বিষয়ে বৈঠক হলেও কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত ছাড়াই তা শেষ হয়। মার্কিন গণমাধ্যম সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, ট্রাম্প খসড়া চুক্তির কিছু শর্তে পরিবর্তন বা সংশোধনের দাবি করায় আলোচনা স্থবির হয়ে পড়েছে।
ট্রাম্পের প্রধান দুটি শর্ত ও ইরান সংকট
১. হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা: ট্রাম্পের দাবি, হরমুজ প্রণালী সব ধরনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত এবং উন্মুক্ত রাখতে হবে। একই সাথে গত কয়েক মাসে স্থাপিত সব সামুদ্রিক মাইন ইরানকে সরিয়ে নিতে হবে।
২. উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ: চুক্তির আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় বন্ধ করতে হবে এবং তাদের কাছে থাকা উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মার্কিন নিয়ন্ত্রণে ধ্বংস বা সরিয়ে ফেলতে হবে।
এর বিপরীতে ইরানের প্রধান আলোচক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তেহরান কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে না। আইআরজিসি-র ঘনিষ্ঠ মহলগুলো বলছে, মার্কিন ব্লকেড বা অবরোধের মুখে একটি 'খারাপ চুক্তি' মেনে নেওয়ার চেয়ে আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসাই শ্রেয়।
বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সংকটের শঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই তিন মাসব্যাপী যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ থাকার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ (২০%) এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হয়।
এই নৌপথটি কার্যত বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে, যার চাপ পড়ছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। এছাড়া বিশ্ববাজারে রাসায়নিক সারের ৩০ শতাংশই সরবরাহ হয় এই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে, ফলে এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে তীব্র খাদ্য ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
আপাতত ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর প্রস্তাব টেবিলে থাকলেও, ট্রাম্পের শর্ত সংশোধন এবং ইরানের অনমনীয় অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্য শান্তিচুক্তির দিকে এগোচ্ছে নাকি নতুন করে এক ভয়াবহ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে- তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
এএন