আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জুন ৮, ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম
দীর্ঘ ছয় বছর পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং পুনরায় পিয়ংইয়ং সফরে গিয়েছেন। ২০১৯ সালের পর উত্তর কোরিয়ার মাটিতে এটিই তার প্রথম পা রাখা। আপাতদৃষ্টিতে এই সফরকে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের নবায়ন মনে হলেও, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর কৌশলগত হিসাব-নিকাশ, ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা এবং প্রভাব বিস্তারের এক সূক্ষ্ম লড়াই। শি জিনপিংয়ের জন্য উত্তর কোরিয়া এমন এক প্রতিবেশী, যাকে চীন যেমন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, আবার কোনোভাবেই হাতছাড়া করতেও রাজি নয়।
ঐতিহাসিকভাবে চীন ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ককে 'রক্তের বন্ধনে গড়া হিসেবে অভিহিত করা হয়, যা কোরিয়ান যুদ্ধের সময় থেকে চলে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক অবিশ্বাস এই সম্পর্কে ফাটল ধরিয়েছে। বর্তমানে বেইজিং তার এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু চরম অনিশ্চিত প্রতিবেশীর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
চীন তার সীমান্তে স্থিতিশীলতা চায় এবং পিয়ংইয়ংয়ের ওপর প্রভাব বজায় রাখতে চায়, তবে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কারণে তৈরি হওয়া কোনো আন্তর্জাতিক সংকটে নিজে সরাসরি জড়াতে রাজি নয়। তাই শি জিনপিংয়ের এই সপ্তাহের সফরটি কেবলই বন্ধুত্বের খাতিরে নয়, বরং উত্তর কোরিয়ার ওপর চীনের 'লিভারেজ' বা প্রভাব খাটানোর একটি সুনির্দিষ্ট প্রয়াস।
মস্কো-পিয়ংইংয়ের ঘনিষ্ঠতা এবং বেইজিংয়ের অস্বস্তি
দক্ষিণ কোরিয়ার ধারণা, চীন হয়তো ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে চাইছে। তবে পশ্চিমা কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বেইজিংয়ের আসল উদ্বেগ অন্য জায়গায়। সাম্প্রতিক সময়ে মস্কো এবং পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে বাড়তে থাকা সামরিক ও রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব চীনকে গভীরভাবে চিন্তিত করে তুলেছে।
বিশেষ করে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে বৈঠকের পরপরই শি জিনপিংয়ের এই পিয়ংইয়ং সফর ইঙ্গিত দেয় যে, তিনি কিম জং উনকে নিজের কক্ষপথে ধরে রাখতে চান, যাতে বৈশ্বিক মঞ্চে চীনের অবস্থান দুর্বল না হয়।
চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যকার সম্পর্কের এই শীতলতা বেশ কিছুদিন ধরেই স্পষ্ট ছিল, যদিও তা ছিল বেশ সূক্ষ্ম। ২০২৪ সালের অক্টোবরে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫তম বার্ষিকী অত্যন্ত মৃদুভাবে উদযাপন করা হয়। তার আগের মাসে উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে চীনের রাষ্ট্রদূত অনুপস্থিত ছিলেন। পুরো বছরজুড়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো উচ্চপর্যায়ের সফর বা আলোচনা হয়নি।
এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গেছে উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার সম্পর্কে। ইউক্রেন আক্রমণের পর রাশিয়ার ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জারি হলে পিয়ংইয়ংয়ের সাথে মস্কোর সামরিক সহযোগিতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০২৪ সালে পুতিনের পিয়ংইয়ং সফরের সময় দুই দেশ একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে।
একটি তদন্তে জানা গেছে, রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিয়ে প্রায় ২,৩০০ উত্তর কোরিয়ান সেনা নিহত হয়েছে। এছাড়া রাশিয়ার যুদ্ধাস্ত্রের জোগান দেওয়ার বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া তেল ও অর্থনৈতিক সহায়তা পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস-এর পারমাণবিক নীতি বিশেষজ্ঞ অঙ্কিত পান্ডা মনে করেন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার এই দ্রুত ঘনিষ্ঠতার সময়ে চীন মূলত উত্তর কোরিয়ার ওপর নিজের স্বার্থ এবং প্রভাব সুরক্ষিত নিশ্চিত করতে চাইছে। চীনের একমাত্র আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে উত্তর কোরিয়ার সাথে।
ফলে পিয়ংইয়ংয়ের ওপর ক্রেমলিনের প্রভাব একচ্ছত্র হয়ে উঠুক, তা বেইজিং কখনই মেনে নেবে না। কিম জং উন যদি রাশিয়ার সহায়তায় স্বাবলম্বী হয়ে ওঠেন, তবে উত্তর কোরিয়ার ওপর চীনের রাজনৈতিক লিভারেজ বা নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই কমে যাবে।
ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য ও পারমাণবিক সংকট
মস্কো-পিয়ংইয়ং সম্পর্কের বিষয়ে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি এশিয়া সেন্টারের ভিজিটিং স্কলার লি সিওং-হিয়ন জানান, এই সমীকরণে চীনের 'মিশ্র অনুভূতি' রয়েছে। একদিক থেকে দেখলে, রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া অক্ষ ওয়াশিংটনের মনোযোগ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয় এবং একাধিক অঞ্চলে মার্কিন কৌশলকে জটিল করে তোলে, যা পরোক্ষভাবে চীনের জন্য সুবিধাজনক।
কিন্তু অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে, এই সামরিক সহযোগিতা যদি এশিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে একটি শক্তিশালী ত্রিপক্ষীয় সামরিক জোটের জন্ম দেয়, তবে তা চীনের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
এই কারণেই চীন পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সরাসরি সমর্থন করে না। কারণ উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক আস্ফালন এই অঞ্চলে আমেরিকার সামরিক উপস্থিতি এবং মিত্রদের আরও শক্তিশালী করবে। আবার একই সাথে চীন উত্তর কোরিয়াকে সরাসরি চেপে ধরতেও পারছে না।
২০২২ সালে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রের আনা নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবে চীন ও রাশিয়া যৌথভাবে ভেটো দিয়েছিল। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ফরেন পলিসি বিভাগের প্রেসিডেন্ট ভিক্টর চা-এর মতে, চীন যদি পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়, তবে তা উত্তর কোরিয়াকে পুরোপুরি পুতিনের কোলে ঠেলে দেবে। বেইজিং কোনোভাবেই এই ঝুঁকি নিতে চায় না।
অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং কিমের বাস্তববাদী রাজনীতি
উত্তর কোরিয়া যতই রাশিয়ার দিকে ঝুঁকুক না কেন, কিম জং উনও ভালো করেই জানেন যে তিনি তার সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক ও মানবিক সহায়তাকারী দেশ চীনকে পুরোপুরি চটাতে পারবেন না।
গত বছর উত্তর কোরিয়ায় চীনের রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। দীর্ঘ ছয় বছর বন্ধ থাকার পর চলতি বছরের শুরুতে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন পরিষেবা পুনরায় চালু করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি উত্তর কোরিয়াকে পুনরায় নিজের অর্থনৈতিক কক্ষপথে টেনে আনার জন্য চীনের একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। কিম জং উনের জন্যও এটি একটি বাস্তবসম্মত ও বাধ্যতামূলক পছন্দ। ইউক্রেন যুদ্ধ যদি কোনোদিন শেষ হয়, তবে রাশিয়ার কাছে উত্তর কোরিয়ার গুরুত্ব এবং সামরিক প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে যাবে।
তাছাড়া পুতিন যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় বিচ্ছিন্ন, সেখানে শি জিনপিং নিয়মিত বেইজিংয়ে বিশ্বনেতাদের স্বাগত জানাচ্ছেন। ফলে কিম কোনো দুর্বল ও সাময়িক অংশীদারের ওপর পুরোপুরি ভরসা করে নিজের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে ফেলতে পারেন না।
সম্পর্কের ঐতিহাসিক টানাপোড়েন
চীন ও উত্তর কোরিয়ার এই সম্পর্ক প্রথম থেকেই বেশ জটিল ও সমস্যাপীড়িত ছিল। কিম জং উন ক্ষমতায় আসার পর তার বাবার (কিম জং ইল) নীতি থেকে সরে আসেন। কিম জং ইল যেখানে বারবার চীন সফর করতেন এবং বেইজিংয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন, সেখানে তার ছেলে ক্ষমতায় এসেই উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিকে তীব্র গতিতে এগিয়ে নিয়ে যান। ক্ষমতায় আসার প্রথম ছয় বছরেই তিনি প্রায় ৯০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং চারটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটান, যা তার বাবা ও দাদার আমলের সম্মিলিত সংখ্যার চেয়েও বেশি।
কিমের এই আচরণ বেইজিংকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। এর ওপর চীনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার অন্যতম কারিগর এবং কিমের নিজের ফুফা জ্যাং সং থেককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে দুই দেশের সম্পর্কে চরম ফাটল ধরে। ক্ষুব্ধ শি জিনপিং ২০১৪ সালে কিমের সাথে দেখা করার আগেই দক্ষিণ কোরিয়া সফর করেন, যা ছিল উত্তর কোরিয়ার প্রতি একটি প্রকাশ্য কূটনৈতিক চপেটাঘাত। উত্তর কোরিয়াও এর জবাবে চীনকে 'বিশ্বাসঘাতক এবং শত্রু' বলে আখ্যায়িত করেছিল।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালে যখন পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তোলে, তখন কিম বাধ্য হয়ে তার সাঁজোয়া ট্রেনে চেপে বেইজিং সফরে যান। সেটিই ছিল দুই দেশের সম্পর্কের এক সতর্ক পুনর্বিন্যাস।
এরপর কিম যখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা দক্ষিণ কোরিয়ার নেতাদের সাথে বৈঠকে বসেছেন, তার আগে সবসময় বেইজিংয়ের সাথে পরামর্শ করেছেন। বার্তাটি পরিষ্কার ছিল- চীনের সমর্থন ছাড়া পিয়ংইয়ং কোনো আন্তর্জাতিক আলোচনা বা দরকষাকষিতে যাবে না।
বাফার বনাম বোঝা, সম্পর্কের ভবিষ্যৎ
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উত্তর কোরিয়া চীনের জন্য একই সাথে একটি 'বাফার স্টেট' (সুরক্ষা প্রাচীর) এবং একটি 'বোঝা'। এটি ভৌগোলিকভাবে মার্কিন বাহিনীকে চীনের সীমান্ত থেকে দূরে রাখে, কিন্তু এর লাগাতার অস্ত্র পরীক্ষা অঞ্চলটিকে প্রতিনিয়ত অস্থিতিশীল করে তোলে, যা চীনের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার জন্য ক্ষতিকর। অন্যদিকে, কিম জং উন চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক সুরক্ষা চান, তবে বেইজিংয়ের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ মেনে নিতে নারাজ।
সংক্ষেপে বলা যায়, চীন ও উত্তর কোরিয়া- কোনো পক্ষই একে অপরকে পুরোপুরি বিশ্বাস করে না। কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে এবং ওয়াশিংটনকে কাউন্টার করতে তারা একে অপরকে অপরিহার্য মনে করে। আর এই পারস্পরিক স্বার্থের দেওয়ালটিই আপাতত তাদের আলোচনার টেবিলে বসিয়ে রেখেছে, যার সর্বশেষ প্রমাণ শি জিনপিংয়ের এই বহুল আলোচিত পিয়ংইয়ং সফর।
এএন