আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জুন ১৩, ২০২৬, ০২:২৯ পিএম
দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত এবং তীব্র অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধের পর অবশেষে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচি এক রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান লড়াই ও যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটাতে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়া।
একই সঙ্গে ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করার বিষয়টিকেও এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে মূল আলোচনাটি পরবর্তী ধাপে বা পরে শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারাও এই চুক্তির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ও বিবরণ নিশ্চিত করেছেন। তবে ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইরানকে কোনো ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়ার আগে তেহরানকে চুক্তির সমস্ত বাধ্যবাধকতা ও শর্ত অক্ষরে অক্ষরে পূরণ করতে হবে।
সংঘাতের প্রেক্ষাপট কীভাবে শুরু হয়েছিল এই যুদ্ধ?
চলতি বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্য করে একযোগে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এই আকস্মিক ও বিধ্বংসী হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারা ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরে অবস্থানরত মার্কিন মিত্র রাষ্ট্রগুলোর ওপর পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে, যখন ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ কার্যকরভাবে বন্ধ করে দেয়। উল্লেখ্য, বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এটি বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট এবং তেলের দাম এক লাফে আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে।
পরবর্তীতে গত এপ্রিল মাসে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি অর্জিত হলে তেহরানের রাস্তায় কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে। তবে যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মাঝেমধ্যেই চোরাগোপ্তা হামলা ও গোলাগুলি বিনিময় অব্যাহত ছিল। এমনকি চলতি সপ্তাহের শুরুতেও দুই দেশের মধ্যে ‘ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়’ এমন নীতিতে দুই দফা পাল্টাপাল্টি হামলা চালানো হয়।
ট্রাম্পের অবস্থান এবং কূটনৈতিক নাটকীয়তা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানান যে, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে পূর্বনির্ধারিত কিছু 'তফসিলি সামরিক হামলা' বাতিল । ট্রাম্পের দাবি, দুই দেশের মধ্যস্থতাকারীরা 'মাত্রই একটি দুর্দান্ত রফাদফা বা সমঝোতা' করতে সক্ষম হয়েছেন এবং খুব শিগগিরই এই চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করা হবে।
তবে এই সমঝোতা প্রক্রিয়ার মধ্যে এক ধরনের নাটকীয়তাও তৈরি হয়। শুক্রবার ইরানের কিছু গণমাধ্যমে একটি ‘১৪-দফা সম্ভাব্য চুক্তি’র খসড়া বিবরণী প্রকাশ করা হয়। এই প্রতিবেদন দেখে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান ট্রাম্প। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, গণমাধ্যমে যা এসেছে, তার সাথে চূড়ান্তভাবে একমত হওয়া শর্তাবলীর কোনো মিল নেই এবং এর সাথে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই। ট্রাম্পের মতে, ইরানিদের সাথে আলোচনার ক্ষেত্রে 'সৎ উদ্দেশ্যে সমঝোতা' বলে আসলে কিছু নেই, সবকিছুই কঠোর শর্তের ওপর নির্ভরশীল।
এর কয়েক ঘণ্টা পরেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ পরিস্থিতি শান্ত করতে একটি বিবৃতি দেন। পাকিস্তান ও কাতার যৌথভাবে এই মার্কিন-ইরান সংকটে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। শেহবাজ শরিফ নিশ্চিত করেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়েছে এবং এটি এখন কেবল আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে স্বীকার করেছেন যে, এই চুক্তির সর্বশেষ শর্তাবলী নিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মহল অর্থাৎ ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’এর ভেতরে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। কাউন্সিলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকেই এই চুক্তির পক্ষে, আবার অনেকেই এর কিছু শর্তের তীব্র বিরোধী।
আরাগচি বলেন, এখন পর্যন্ত একটি যৌথ বা সম্মিলিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। আপাতত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। তবে যদি এটি সর্বোচ্চ মহলে অনুমোদিত হয়, তবে চুক্তিটি দূরবর্তী বা রিমোটলি (অনলাইনের মাধ্যমে) স্বাক্ষরিত হবে। তিনি আরও যোগ করেন, আমাদের আলোচনার চূড়ান্ত ধাপগুলো সম্পন্ন হওয়া মাত্রই এই চুক্তি সই হবে এবং তা বিশ্ববাসীর সামনে ঘোষণা করা হবে। আমি অত্যন্ত আশাবাদী যে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই এটি ঘটতে পারে।
চুক্তির মূল শর্তাবলী এবং ৬০ দিনের সময়সীমা
মার্কিন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের দেওয়া এক বিস্তারিত ব্রিফিংয়ে এই চুক্তির মূল রূপরেখা এবং রোডম্যাপ প্রকাশ করা হয়েছে। চুক্তিটি মূলত 'পারফরম্যান্স' বা কর্মদক্ষতার ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে, কোনো মুখের কথা বা বিশ্বাসের ওপর নয়।
মার্কিন কর্মকর্তারা জোরালোভাবে জানিয়েছেন যে, ইরানকে কোনো ধরনের অগ্রিম অর্থ দেওয়া হবে না। ইরানি গণমাধ্যমের দাবি ছিল যে আলোচনার আগেই তাদের কিছু ফ্রিজ হওয়া বা জব্দ করা অর্থ অবমুক্ত করা হবে, কিন্তু ওয়াশিংটন সেই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরান প্রতিটি শর্ত পূরণ করার পর আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের দ্বারা তা যাচাই করা হবে, এবং কেবল তখনই তারা অর্থনৈতিক ছাড় পাবে।
হরমুজ প্রণালী ও আঞ্চলিক রাজনীতির সমীকরণ
হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করার বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই জলপথের প্রশাসন বা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা "আগের মতো আর থাকবে না"।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার পর থেকে ইরান দাবি করে আসছিল যে এই পথ দিয়ে চলাচলকারী প্রতিটি বাণিজ্যিক জাহাজকে ইরানকে নির্দিষ্ট ফি বা ট্যাক্স দিতে হবে। পক্ষান্তরে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দাবি ছিল, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এই প্রণালী দিয়ে সমস্ত দেশের নৌযান ফ্রিতে এবং অবাধে চলাচল করতে পারবে। নতুন চুক্তিতে এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ভাগাভাগি বা আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণের একটি মধ্যপন্থা খোঁজা হচ্ছে।
আরাগচি আরও দাবি করেন যে, এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে ইসরায়েল এবং লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যকার দীর্ঘদিনের সংঘাতেরও অবসান ঘটবে। ইরান প্রথম থেকেই জেদ ধরে আসছিল যে লেবানন পরিস্থিতিকে এই চুক্তির অংশ করতে হবে।
যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী কিছু প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে লেবানন এই চুক্তির বাইরে থাকবে। তবে এই শান্তি প্রক্রিয়ায় ইসরায়েল সরাসরি যুক্ত নেই। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে সতর্ক করে বলেছেন, হিজবুল্লাহ যদি উত্তর ইসরায়েলে রকেট বা ড্রোন হামলা অব্যাহত রাখে, তবে ইসরায়েল তাদের ওপর কঠোর সামরিক আঘাত হানতে দ্বিধা করবে না।
সতর্ক আশাবাদ ও শান্তির নতুন সকাল
বিগত এক বা দুই মাসে এই ধরনের চুক্তির সম্ভাবনা বেশ কয়েকবার তৈরি হয়েছিল, কিন্তু প্রতিবারই শেষ মুহূর্তে তা ভেস্তে যায়। তবে মার্কিন প্রশাসনের মতে, এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। এবার দুই পক্ষই অনেক বেশি ইতিবাচক এবং চুক্তির বাস্তব শর্তগুলো নিয়ে অনেক বেশি খোলামেলা আলোচনা করছে। কাতার এবং পাকিস্তানের নিরলস কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এই বরফ গলাতে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
এই চুক্তি যদি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়, তবে তা কেবল ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই নয়, বরং পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বিশাল স্বস্তি এনে দেবে। হরমুজ প্রণালী খুলে দিলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, কমবে মূল্যস্ফীতি।
দশকের পর দশক ধরে পরমাণু অস্ত্র তৈরির যে অভিযোগ পশ্চিমা বিশ্ব ইরানের বিরুদ্ধে এনেছে, তারও একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়তো এই ৬০ দিনের আলোচনার মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনীতিতে শেষ মুহূর্তে কী ঘটে, তা দেখার জন্য আপাতত পুরো বিশ্বকে আরও কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
এএন