ক্রীড়া ডেস্ক
জুন ১৩, ২০২৬, ০১:৪৮ পিএম
এখনো টুর্নামেন্টের অনেক পথ বাকি, আর এই সত্যটি বিশ্বখ্যাত আর্জেন্টাইন কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনো নিজেই সবচেয়ে ভালো জানেন। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই শুভসূচনা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
একটি আসরে নিজেদের প্রথম ম্যাচে জয় কেবল ৩টি পয়েন্টই এনে দেয় না, বরং পুরো দেশের মানুষের মনে বিশ্বাস এবং ফুটবলীয় উদ্দীপনার জোয়ার তৈরি করে। পচেত্তিনোর মার্কিন ব্রিগেড ঠিক সেই কাজটিই সফলভাবে করে দেখিয়েছে।
উদ্বোধনী ম্যাচের এই চোখধাঁধানো জয় মার্কিন ফুটবল ভক্তদের মনে এক নতুন আশার আলো জ্বেলেছে, যা তাদের আগামী ম্যাচগুলোর জন্য দারুণ এক মানসিক শক্তি যোগাবে।
লস অ্যাঞ্জেলেসের ভোলবদল
বিশ্বকাপের বাঁশি বাজার ঠিক আগমুহূর্ত পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। বিশেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেস শহরের মতো ব্যস্ত মহানগরে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বোধনী ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, সেখানে বোঝার উপায় ছিল না যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসব শুরু হতে যাচ্ছে। রাস্তাঘাট, শপিংমল বা সাধারণ আড্ডায় বিশ্বকাপের তেমন কোনো আবহ ছিল না।
তবে শুক্রবারের সূর্য ওঠার সাথে সাথেই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায়। পুরো শহর যেন রাতারাতি মার্কিন ফুটবলের রঙে রেঙে ওঠে।
সকাল থেকেই লস অ্যাঞ্জেলেসের মেট্রো ট্রেনগুলোতে মার্কিন জাতীয় দলের (USA) জার্সি পরা সমর্থকদের ভিড় জমতে শুরু করে।
শহরের ক্যাফে, রেস্তোরাঁ এবং স্পোর্টস বারগুলো কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। ম্যাচ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে থেকেই শুরু হয় ফুটবল নিয়ে তুমুল আলোচনা।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম ম্যাচে যদি যুক্তরাষ্ট্র জয় না পেত, তবে এই সদ্য জাগ্রত হওয়া ফুটবল উন্মাদনা এবং উত্তেজনা শুরুতেই স্তিমিত হয়ে যেতে পারত।
কিন্তু মাঠের জয়ে চিত্রটি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। গ্রুপ পর্বে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী দুটি ম্যাচ রয়েছে যথাক্রমে 'তুরস্ক 'এবং অস্ট্রেলিয়ার, বিরুদ্ধে। প্রথম ম্যাচের এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, পরবর্তী ম্যাচগুলোতে গ্যালারিতে মার্কিন সমর্থকদের গর্জন আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে।
মার্কিন আধিপত্য ও ড্যানি মারফির প্রশংসা
প্রথম ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের রণকৌশল এবং মাঠের নিয়ন্ত্রণ ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়। বিশেষ করে প্রথমার্ধে তারা প্রতিপক্ষকে দাঁড়াতেই দেয়নি। পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, ম্যাচের প্রথমার্ধে ৭১% সময় বল ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে , যা আধুনিক ফুটবলে যেকোনো দলের জন্য এক বিশাল আধিপত্যের প্রমাণ।
বিবিসির বিখ্যাত অনুষ্ঠান 'ম্যাচ অব দ্য ডে' তে সাবেক লিভারপুল মিডফিল্ডার এবং ফুটবল বিশ্লেষক ড্যানি মারফি যুক্তরাষ্ট্রের এই পারফরম্যান্সের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, তাদের দেখে অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি দল মনে হচ্ছে। তারা শতভাগ ফিট, ক্ষুরধার এবং গোলের জন্য ক্ষুধার্ত। যখন কোনো দল মাঠে এত সুন্দর ফুটবল খেলে, তখন গ্যালারির দর্শকরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের পেছনে এসে দাঁড়ায়। আর এই স্টেডিয়ামের সিংহভাগ দর্শক যখন আপনার পক্ষে চিৎকার করবে, তখন প্রতিপক্ষের জন্য পরিবেশটা কতটা ভীতিকর হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক
বিশ্বকাপের রোমাঞ্চ কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মাঠের বাইরের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য ম্যাচের রেফারিং সিদ্ধান্ত নিয়েও। বিশেষ করে বোসনিয়ার একটি ম্যাচে লাল কার্ড , দেওয়া নিয়ে ফুটবল বিশ্ব এবং বিবিসির স্টুডিওতে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ম্যাচের একটি নির্দিষ্ট ফাউলকে কেন্দ্র করে বিবিসির ফুটবল পণ্ডিতদের মধ্যে স্পষ্ট বিভক্তি দেখা দেয়। ফুটবল বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ফাউলটি এতটাই মারাত্মক ছিল যে রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে খেলোয়াড়কে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিয়ে একদম সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এটি ফুটবলারদের সুরক্ষার খাতিরে অত্যন্ত জরুরি ছিল।
তবে অপর পক্ষ এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাদের দাবি, চ্যালেঞ্জটি বিপজ্জনক ছিল না, বরং খেলোয়াড়টি নিখুঁতভাবে বলের নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিলেন। এটি বড়জোর একটি হলুদ কার্ড বা সাধারণ ফাউল হতে পারত, কিন্তু লাল কার্ড দেওয়াটা অতিরিক্ত কড়া শাস্তি হয়ে গেছে।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে রেফারিংয়ের এমন সূক্ষ্ম ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো যে পুরো টুর্নামেন্টের ভাগ্য বদলে দিতে পারে, এই ঘটনাটি আবারও তা প্রমাণ করল।
বিশ্বকাপের 'অল-নাইটার' বা রাত জাগার মহাকাব্য
যেহেতু এবারের বিশ্বকাপ বিভিন্ন টাইম জোনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তাই বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবল ভক্তকে প্রিয় দলের খেলা দেখার জন্য রাত জাগতে হচ্ছে। রাত জেগে টানা ফুটবল ম্যাচ দেখা এবং পরদিন কর্মক্ষেত্রে নিজেকে সতেজ রাখা এক মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ। বিবিসি এই ফুটবলপ্রেমীদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও বৈজ্ঞানিক পরামর্শ বা 'সারভাইভাল গাইড' প্রকাশ করেছে।
ক্যাফেইন নিয়ন্ত্রণ: ম্যাচ শুরুর ঠিক আগে অতিরিক্ত কফি বা এনার্জি ড্রিংকস খাওয়া থেকে বিরত থাকুন। এটি সাময়িক শক্তি দিলেও পরে শরীরকে দ্রুত ক্লান্ত করে দেয়।
খাবার দাবারের অভ্যাস: ভারী ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন। হালকা স্ন্যাক্স, ফলমূল বা বাদাম জাতীয় খাবার খান। ভারী খাবার শরীরকে অলস করে তোলে এবং ঘুমের ভাব বাড়ায়।
হাইড্রেশন (পানি) পর্যাপ্ত পরিমাণে জল বা পানি পান করুন। শরীরে পানির ঘাটতি না থাকলে ক্লান্তি ভাব কম আসে এবং মনোযোগ বজায় থাকে।
কৌশলগত ঘুম ম্যাচ শুরুর আগে সন্ধ্যায় বা রাতে ১-২ ঘণ্টার একটি ছোট ঘুম বা ন্যাপ নিয়ে নিন। এটি মস্তিষ্কের ক্লান্তি দূর করে গভীর রাতেও আপনাকে সজাগ রাখতে সাহায্য করবে। ।
স্বপ্নের বিশ্বকাপ এবং ফুটবলের জয়
২০২৬ বিশ্বকাপ কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, এটি বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের আবেগ, উদ্দীপনা এবং সংস্কৃতির মেলবন্ধন। একদিকে যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ক্রিকেট ও বাস্কেটবল-প্রধান দেশে ফুটবলের জোয়ার বইতে শুরু করেছে, অন্যদিকে মাঠের ভেতরের নানা বিতর্ক আর ভক্তদের রাত জাগার উন্মাদনা এই আসরকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলছে।
মাউরিসিও পচেত্তিনোর হাত ধরে যুক্তরাষ্ট্র দল কি পারবে তাদের এই জয়ের ধারা বজায় রেখে বিশ্বমঞ্চে নতুন কোনো ইতিহাস গড়তে? নাকি তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়া তাদের এই জয়রথ থামিয়ে দেবে? আর বোসনিয়ার মতো বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো টুর্নামেন্টের গতিপথ কোন দিকে মোড় নেয়, তা দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে পুরো ফুটবল বিশ্ব। তবে আপাতত, ফুটবলের এই মহোৎসবে মেতে থাকার আনন্দেই বুঁদ হয়ে আছেন সমর্থকেরা।
এএন