ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬, ০১:৪৯ পিএম
ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক কারণে বাংলাদেশের মানচিত্রের যে অংশটি আমাদের পরম মমতায় আগলে রাখে, সেটি হলো সুন্দরবন। আজ সেই বনের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের দিন। ২০০১ সাল থেকে শুরু হওয়া এই দিবসটি আজ ২৬তম বছরে পদার্পণ করল।
এবারের দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণমুক্ত সুন্দরবন এবং জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরাসহ উপকূলীয় অঞ্চলে বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বন বিভাগের উদ্যোগে র্যালি, মানববন্ধন ও আলোচনা সভার মাধ্যমে দিবসটি উদযাপন করা হচ্ছে।
সুন্দরবন দিবসের ইতিহাস খুব বেশি পুরনো না হলেও এর তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। ২০০১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের বাপা নেতৃত্বে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রূপান্তর ও পরশসহ প্রায় ৭০টি পরিবেশবাদী সংগঠনের অংশগ্রহণে প্রথম জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেই সম্মেলনেই সুন্দরবনের গুরুত্ব বিবেচনা করে এবং একে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারিকে সুন্দরবন দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
সুন্দরবন দিবস উদযাপনের আনন্দ থাকলেও বনের বর্তমান অবস্থা নিয়ে পরিবেশবিদদের মাঝে রয়েছে গভীর উদ্বেগ। বন সংশ্লিষ্টরা বলেন, সুন্দরবন বর্তমানে ত্রিমুখী সংকটের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, যার ফলে বনের অভ্যন্তরে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে। এতে সুন্দরীসহ অনেক মূল্যবান গাছ আগাম মরে যাচ্ছে।
পর্যটক এবং বনজীবীদের মাধ্যমে বনের গহীনে নিক্ষিপ্ত প্লাস্টিক বর্জ্য মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে এবং বন্যপ্রাণীদের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বিষ দিয়ে মাছ ধরা, হরিণ শিকার এবং চোরাই পথে কাঠ পাচার রোধ করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
প্রকৃতির এই অপার বিস্ময় সুন্দরবন কেবল গাছপালার সমারোহ নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তুসংস্থান। বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ অংশের মোট আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। এখানে ৫২৮ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ৫০৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী রয়েছে। যার মধ্যে ৩৫৫ প্রজাতির পাখি ও ৮৭ প্রজাতির সরীসৃপ অন্তর্ভুক্ত। বৈশ্বিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে সুন্দরবন ১৯৯২ সালে রামসার সাইট এবং ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পায়।
খুলনা অঞ্চলের পরিবেশকর্মী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনকে রক্ষা করা কেবল উপকূলীয় মানুষের দায়িত্ব নয়, এটি একটি জাতীয় ও বৈশ্বিক আবশ্যকতা। তাঁরা মনে করেন, সুন্দরবন রক্ষায় কেবল একদিনের আনুষ্ঠানিকতা যথেষ্ট নয়, বরং সারা বছর বনজ সম্পদ আহরণে টেকসই নীতিমালা এবং প্লাস্টিক মুক্ত বন নিশ্চিত করতে কঠোর আইন প্রয়োগ প্রয়োজন। বিশেষ করে এবারের সুন্দরবন দিবসে দাবি উঠেছে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় শিল্পায়ন নিয়ন্ত্রণে আনা এবং বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
সুন্দরবন আমাদের প্রাকৃতিক ঢাল। সিডর, আইলা কিংবা আম্পানের মতো প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় থেকে এই বনই বুক পেতে রক্ষা করেছে বাংলাদেশকে। তাই সুন্দরবন দিবস কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, এটি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার অঙ্গীকার। আজকের এই দিনে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটুক বনের প্রতিটি গাছ আর প্রতিটি প্রাণীর প্রতি।
জেএইচআর
