ওমর ফারুক
অক্টোবর ২৯, ২০২৫, ০৩:৫৮ পিএম
ছোট ছোট গাছের সারি, মাঝখানে সরু পায়ে হাঁটা পথ। সূর্যের আলো ঘন পাতার ফাঁক গলে মাটিতে পড়ে ছোপ ছোপ দাগ ফেলে যাচ্ছে। চারপাশে এমন ঘন সবুজ যে মনে হবে, এটি হয়তো শত বছরের পুরোনো কোনো জঙ্গল। অথচ জায়গাটা চট্টগ্রামের মীরসরাই, আর এই বনটির বয়স মাত্র তিন বছর।
দেশজুড়ে একের পর এক বনভূমি উজাড় হচ্ছে, পাহাড় কেটে বানানো হচ্ছে রিসোর্ট, নদীর তীর ভরাট হচ্ছে কংক্রিটে। এমন সময়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে মীরসরাইয়ে গড়ে উঠেছে দেশের প্রথম ‘মিয়াওয়াকি ফরেস্ট’ যা হয়তো বাংলাদেশের সবুজ ভবিষ্যতের নতুন এক দিকনির্দেশ।
‘মিয়াওয়াকি’ এক জাপানি পদ্ধতির সবুজ চমক: জাপানের উদ্ভিদবিদ অধ্যাপক আকিরা মিয়াওয়াকি উদ্ভাবন করেছিলেন বন তৈরির এক অভিনব পদ্ধতি, যেখানে মাত্র ২০–৩০ বছরের মধ্যেই তৈরি হয় শতবর্ষী ঘন জঙ্গলের সমান বনাঞ্চল।
মূল ধারণা সহজ: স্থানীয় প্রজাতির গাছগুলো ঘনবদ্ধভাবে একসাথে রোপণ করা হয়, যাতে তারা আলোর জন্য প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পায়। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বনের তুলনায় এই বন ১০ গুণ দ্রুত বেড়ে ওঠে, এবং ৩০ গুণ বেশি কার্বন-ডাইঅক্সাইড শোষণ করতে সক্ষম হয়।
ভারত, নেদারল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে গড়ে উঠেছে শত শত ছোট বন। আর এবার সেই পথেই হাঁটছে বাংলাদেশও।
মীরসরাইয়ের ‘সোনাপাহাড় প্রকল্প’ ছোট জমিতে সবুজ বিস্ময়: চট্টগ্রামের মীরসরাই উপজেলার সোনাপাহাড় এলাকায় মাত্র ৪ হাজার ৪০০ বর্গফুট জায়গায় লাগানো হয়েছে ১২০ প্রজাতির গাছ ও লতাগুল্ম। মাত্র তিন বছরেই জায়গাটি পরিণত হয়েছে এক ঘন জঙ্গলে, যেখানে পাখি, প্রজাপতি ও ছোট প্রাণীর আবাস গড়ে উঠেছে স্বাভাবিক নিয়মেই।
প্রকল্পের উদ্যোক্তা ও প্রাকৃতিক কৃষি কেন্দ্রের পরিচালক দেলোয়ার জাহান জানালেন, “মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে এক মিটার ঢালু জমিতে জৈব উপাদান মিশিয়ে মাটি তৈরি করা হয়। রাসায়নিক সার নয় ব্যবহার করা হয় গুঁড়ি, খড় ও পচা লতাপাতা। এরপর একসাথে ঘনবদ্ধভাবে বিভিন্ন প্রজাতির চারা লাগানো হয়। তিন বছর পর থেকেই বনটি প্রায় রক্ষণাবেক্ষণ-মুক্ত হয়ে যায়। তাঁর দাবি, এই পদ্ধতিতে দশ বছরে শত বছরের সমান ঘন বন গড়ে ওঠে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মোট ভূমির ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল থাকা প্রয়োজন, কিন্তু বাস্তবে তা মাত্র ১৫দশমিক ৫৮ শতাংশ। দ্রুত নগরায়ন, শিল্পায়ন ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে সেই সামান্য বনও হারিয়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মো. দানেশ মিয়া মনে করেন, “মিয়াওয়াকি কনসেপ্ট জাপান থেকে এসেছে বটে, কিন্তু এই ধরনের ঘন ছোট বন বাংলাদেশের গ্রামেও একসময় স্বাভাবিকভাবে ছিল। তবে অতিরিক্ত মানুষের চাপেই তা হারিয়ে গেছে। এখন এই পদ্ধতি দিয়ে হয়তো সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”
পরিবেশকর্মী সৈয়দা সারওয়ার জাহান, যিনি পার্বত্য এলাকায় সামাজিক বনায়ন নিয়ে কাজ করেন, বলেন, “বাংলাদেশের জায়গার সংকট বিবেচনায় মিয়াওয়াকি পদ্ধতি খুব কার্যকর। স্বল্প জায়গায়, কম খরচে, রাসায়নিক সার ছাড়া বন গড়ে তোলা সম্ভব। এতে একদিকে জলবায়ু ভারসাম্য রক্ষা হবে, অন্যদিকে শহুরে সবুজায়নের চাহিদাও মিটবে।”
শহরের ‘সবুজ দেয়াল’ গড়ে তোলার সম্ভাবনা: বিশ্বের বহু শহরে মিয়াওয়াকি ফরেস্ট এখন ‘Urban Green Wall’ বা শহরের সবুজ দেয়াল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতের দিল্লিতে এই পদ্ধতিতে কয়েক ডজন ছোট বন গড়ে উঠেছে যা ধোঁয়াশা দূষণ কমাতে বাস্তব প্রভাব ফেলছে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম বা রাজশাহীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে যদি প্রতিটি ওয়ার্ডে ১০–১৫টি ছোট আকারের মিয়াওয়াকি বন তৈরি করা যায়, তাহলে তা হতে পারে নগরজীবনের নিঃশ্বাসের জানালা।
বন কেটে উন্নয়ন নয়, উন্নয়নের মধ্যেই বন: বাংলাদেশে এখন উন্নয়নের প্রতিটি মাইলফলক প্রায়ই মাপা হয় ‘কত রাস্তা, কত সেতু, কত ভবন’ দিয়ে। অথচ প্রকৃত উন্নয়ন হলো মাটির প্রাণ, গাছের ছায়া ও বাতাসের শ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখা।
দেলোয়ার জাহান তাই বললেন, “আমরা যদি এক প্রজন্মে বন গড়ি, আর পরের প্রজন্ম ঘরবাড়ি তুলতে গিয়ে সেটি কেটে ফেলে তাহলে সেই বন আমাদের নয়, কেবল স্মৃতির জন্যই থাকবে।”
ভবিষ্যতের আহ্বান: জলবায়ু পরিবর্তন, ঘনবসতি, তাপমাত্রা বৃদ্ধি সব মিলিয়ে বাংলাদেশ আজ এক কঠিন সন্ধিক্ষণে। হয়তো পুরো দেশের বনভূমি ফিরিয়ে আনা এখন স্বপ্ন, কিন্তু মিয়াওয়াকি পদ্ধতি দেখাচ্ছে ছোট পদক্ষেপে বড় পরিবর্তনের পথ।
একটি ছোট উঠান, একটি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, কিংবা কোনো ফাঁকা সরকারি জমি সব জায়গাতেই গড়ে উঠতে পারে এমন মিনি-বন।
সবুজের এই পুনর্জন্ম যদি ছড়িয়ে দেওয়া যায় গ্রাম থেকে শহর, পাহাড় থেকে সমতল তাহলে হয়তো একদিন আবারও বাংলাদেশ ফিরবে তার প্রাকৃতিক রূপে। কারণ, গাছ মানেই জীবন। আর প্রতিটি জীবনই একেকটি বন।
সূত্র: বিবিসি
লেখক: গণমাধ্যম কর্মী।
জেএইচআর