মোহাম্মদ আরিফুর রহমান
জুন ৯, ২০২৬, ০৩:৫৫ পিএম
বাংলাদেশ ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে, উন্নতির ধারাটা ধীরগতি হলেও এগোচ্ছে। দেশের সেক্টরভিত্তিক উন্নয়ন ধারাকে যদি প্যারামিটারে মাপা হয়, তবে দেখা যাবে কিছু ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। সেক্টরওয়ারি দৃশ্যমান উন্নয়নের কথা চিন্তা করলে গার্মেন্টস, কৃষি এবং রেমিট্যান্সের উন্নয়নটি চোখে পড়ে। বিশেষ করে কৃষির উন্নয়ন দৃশ্যমান এবং সর্বজন প্রশংসনীয়। একসময় বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তিই ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। গ্রামকে নিয়েই ছিল দেশের উন্নয়ন ভাবনা।
বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ জীবনের মূলভিত্তি হলো কৃষি এবং কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী। গত বিশ বছরের কৃষি অর্থনীতির ক্রমধারায় এসেছে বেশ কিছু পরিবর্তন। বাজেটে কৃষি অংশের শতকরা হার কমেছে, জিডিপিতে কৃষির অংশ কমেছে এবং একই সঙ্গে কৃষিতে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যাও কমেছে। কিন্তু বেড়েছে কৃষির উৎপাদন। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ফসলি জমি কমার পরও উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে খাদ্যে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পেরেছে। কৃষি খাতে অর্থনৈতিক প্যারামিটার কমার মাঝেও কৃষির উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। মূল লেখায় যাওয়ার আগে কিছু পরিসংখ্যান দেখে নেওয়া যাক।
২০০৬-২০০৭ থেকে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছর পর্যন্ত কৃষি খাতের বাজেট ও অংশগ্রহণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। ২০০৬-২০০৭ অর্থবছরে মোট বাজেট ছিল ৬৯,৭৪০ কোটি টাকা, যার মধ্যে কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল ৬,০০০ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৮.৬ শতাংশ। একই সময়ে কৃষি খাতের জিডিপিতে অবদান ছিল ১৯.১ শতাংশ এবং কৃষি সেক্টরে সম্পৃক্ত জনসংখ্যা ছিল ৫২-৫৪ শতাংশ।
পরবর্তী সময়ে ২০১৬-২০১৭ অর্থবছরে মোট বাজেট বৃদ্ধি পেয়ে ৩,৪০,৬৫০ কোটি টাকায় পৌঁছায়। এ সময়ে কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল ১৪,৫০০ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৪.৩ শতাংশ। এই সময়ে কৃষি খাতের জিডিপিতে অবদান কমে ১৩.৭ শতাংশে নেমে আসে এবং কৃষি সেক্টরে সম্পৃক্ত জনসংখ্যা কমে ৪০.৬ শতাংশে দাঁড়ায়।
সর্বশেষ ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে মোট বাজেট দাঁড়ায় ৭,৯৭,০০০ কোটি টাকা, যেখানে কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৮,২৫৯ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ৪.৮ শতাংশ। এ সময়ে কৃষি খাতের জিডিপিতে অবদান ১১.১৬ শতাংশ এবং কৃষি সেক্টরে সম্পৃক্ত জনসংখ্যা ৪৪.২৬ শতাংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০১৮ হতে ২০২২ পর্যন্ত কৃষি সেক্টরে বাজেট বরাদ্দের হার ছিল সর্বনিম্ন। ওই সময় কৃষিতে মোট বাজেটের মাত্র ২.৭ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়। অথচ স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৭৭-৭৮ সালে মোট বাজেট ছিল ২,১৭৬ কোটি টাকা, আর কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে মোট বাজেটের প্রায় ২৬% ব্যয় করা হয়েছিল। তৎকালীন বিএনপি সরকারের মূল উন্নয়ন ভাবনা ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। তার মানে বর্তমান সরকারি দল জন্ম থেকেই কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নকে ফোকাস করেছে। কৃষিতে বরাদ্দ কমার কারণ হিসেবে শিল্প, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি।
স্বাধীনতা-উত্তর দেশের জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি এবং ৯১.৩ লক্ষ হেক্টর জমিতে খাদ্য উৎপাদন (ধান ও গম) ছিল ১.১ কোটি মে. টন। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি এবং ৭৮.৮ লক্ষ হেক্টর জমিতে খাদ্য উৎপাদন (ধান ও গম) ৪.২৭ কোটি মে. টন। অর্থাৎ দেশের জনসংখ্যা আড়াই গুণ বৃদ্ধি পেলেও জমির পরিমাণ কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ এবং খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে ৪ গুণেরও বেশি।
কৃষিতে প্রতিনিয়ত নানাবিধ চ্যালেঞ্জ বাড়ছে- জলবায়ু পরিবর্তন, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, প্রতিকূল প্রতিবেশসহ নানাবিধ সমস্যা। এসব সমস্যা সমাধান করে কৃষি উন্নয়নের ধারা অব্যাহত আছে। এটিকে ধরে রাখাই এই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ বলে আমার ধারণা। এটি সত্যি যে সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কিন্তু ইশতেহার বাস্তবায়নে প্রয়োগিক দিকগুলো নিয়ে কাজ করা জরুরি।
ইশতেহারে ফসল উৎপাদনকারীর সুরক্ষার জন্য কৃষক কার্ড, ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ, কৃষি বীমার কথা বলা হয়েছে। এতে করে ফসল উৎপাদনকারী কৃষিতে বিনিয়োগে আগ্রহ সৃষ্টি হবে। পূর্বে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যতা নিশ্চিতের বিষয়ে তারা সবসময় শঙ্কায় থাকত। তদুপরি হঠাৎ বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, বাঁধভাঙা এবং প্রতিকূল জলবায়ুজনিত কারণে ফসল রক্ষায় উপকূলীয় এলাকাসহ পাহাড়ি সীমানা-ঘেঁষা কৃষকরা সবসময় চিন্তামগ্ন থাকেন। বিশেষ করে ধান সংগ্রহের মৌসুমে হাকালুকি হাওর এলাকায় হঠাৎ বন্যার কারণে কৃষকরা ঝুঁকির শঙ্কায় থাকেন।
বিশেষ করে এ বছর ফ্ল্যাশ ফ্লাডের কারণে হাওড় এলাকায় কৃষকের কান্না অনেককেই কাঁদিয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টির সঙ্গে সঙ্গে সরকারকে সামাজিক নিরাপত্তা নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। কৃষকরা অনেক সময় স্বল্পমেয়াদি কৃষি ঋণ নিয়ে ফসল ফলানোর পর প্রতিকূল পরিবেশ এবং জলবায়ুর ঝুঁকির কারণে ফসল ঘরে তুলতে সক্ষম হন না। কৃষি বীমা চালু হলে কৃষকদের এসব ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
এরই ধারাবাহিক ভাবনা হিসেবে শস্যবীমার যৌক্তিক দাবিও সামনে আসছে। শস্যবীমাটি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল, সরকার ইতোমধ্যে এটি বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। শস্যবীমা নীতি তৈরির কাজ শুরু করেছে। আশার কথা হলো শস্যবীমার নীতিমালা তৈরি হচ্ছে, আবার কেউ কেউ হতাশায় আছেন- যদি এটি বাস্তবায়ন না হয়। দৃশ্যমান অগ্রগতি মানুষ তখনই দেখবে, যখন বাজেটে এর প্রতিফলন দেখা যাবে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষকের ঝুঁকি হ্রাস এবং কৃষি উৎপাদন স্থিতিশীলতা ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সরকার ভর্তুকি দিয়ে হলেও শস্যবীমা চালুর চিন্তা করছে। এটি খাদ্য নিরাপত্তা সুরক্ষায় কাজ করবে। শস্যবীমা চালুর কিছু ঝুঁকি রয়েছে। এসব ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে দেশের স্বার্থে সরকারের এ পদক্ষেপটিকে অনেকেই সাধুবাদ জানাবে।
কৃষি বাজেটের একটা বড় অংশ ব্যয় হয় সার ভর্তুকি, কৃষিযন্ত্র, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা, বীজ উন্নয়ন, গবেষণা, প্রণোদনা, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প সহায়তা, কৃষিঋণ সহায়তা এবং জলবায়ু-সহনশীল জাত ও প্রযুক্তি উন্নয়নে।
কৃষি উন্নয়নকে কেন্দ্র করে নির্বাচন ইশতেহারে অন্তত ১২টি পয়েন্টে পুরো কৃষি ব্যবস্থার আধুনিক ও বাণিজ্যিকীকরণের বিষয়টি সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে। শিক্ষিত তরুণরা কৃষিভিত্তিক বাণিজ্যে আগ্রহী হচ্ছে, অনেকে প্রবাস জীবন ছেড়ে কৃষি ব্যবসা করছে। কৃষি ব্যবসার ধরনও পরিবর্তন হয়েছে। একসময় দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এমন পণ্য মৌসুমে কম দামে কিনে মজুদ করে অমৌসুমে বিক্রয় করাটাই ছিল মূল কৃষি ব্যবসা। এখন এটি পরিবর্তন হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে যেকোনো কাজই আর্থিক লাভ-ক্ষতি বিবেচনায় আনা হয়। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে লাভ-ক্ষতির হিসাবটি আরও বেশি নিবিড়ভাবে করা হয়। এতদিন আমাদের কৃষি ছিল খোরপোষনির্ভর। কোনোরকম খেয়ে-পরে চলতে পারলেই কৃষকরা খুশি থাকতেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পারিবারিক চাহিদা মেটানো। এই ভাবনা থেকে কৃষকরা বের হয়ে আসছেন। তারাও কৃষিকে ব্যবসা হিসেবে নিতে চাচ্ছেন, লাভ-ক্ষতির হিসাব করছেন। শিক্ষিত যুবকরা কৃষিতে বিনিয়োগ করছেন। তারা কৃষি বিনিয়োগের লাভজনক দিকগুলো বিবেচনায় আনছেন।
সরকারের পরিকল্পনায় এগ্রোপ্রেনারশিপ স্টার্টআপ প্রকল্প গ্রহণ এবং উদ্যোক্তা প্ল্যাটফর্ম গঠনের বিষয়টি যেমন রয়েছে, তেমনি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে টেকসই কৃষি উন্নয়নের পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে করে তরুণ শিক্ষিত যুবকরা কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার পথ তৈরি হলো। মাঠে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার হবে, স্বল্প খরচে মানসম্মত কৃষিজ পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি প্রতিযোগী বাজারমূল্যে গ্রাহক কৃষিপণ্য গ্রহণ করার পথ তৈরি হবে।
উদ্যোক্তারা তাদের সৃষ্টিশীলতা দিয়ে নতুন নতুন কৃষি ব্যবসার প্রসার ঘটাবেন। দেশি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা সমন্বয় করে কৃষি ব্যবসাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। এক্ষেত্রে কৃষিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবসার পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক শিল্পের প্রসার হবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বাণিজ্যিক কৃষির পাশাপাশি জলবায়ু-সহনশীল কৃষির বিষয়টিও সরকারের নজর ও পরিকল্পনায় রয়েছে। জলবায়ু অভিযোজন এবং জলবায়ুর প্রতিকূলতা মোকাবিলায় করণীয় নির্ধারণের বিষয়টিও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।
মোটাদাগে খোরপোষ কৃষি থেকে বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তর, কৃষক সুরক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার জন্য যুগোপযোগী কৃষি প্রবর্তন করা প্রয়োজন। প্রাধান্য দিতে হবে যান্ত্রিকনির্ভর কৃষিতে। কৃষিতে আইটি সেক্টরের ব্যবহার এবং রপ্তানিমুখীকরণ করা সময়ের দাবি। কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণ করা জরুরি।
যেকোনো কাজেই সঠিক এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণে ঘাটতি থাকলে যত ভালো কাজই হোক না কেন, বাস্তবায়নে জটিলতা সৃষ্টি হয়। আবার পরিকল্পনা গ্রহণের পর সঠিক বাস্তবায়নের সমস্যার কারণে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। বাস্তবতা বিবেচনায় এনে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের গুরুত্ব যত দ্রুত দেওয়া যাবে, দেশের কৃষি, কৃষক এবং পুরো বাংলাদেশের মঙ্গল তত দ্রুতই হবে। আসন্ন বাজেটে সরকারের উন্নয়ন ভাবনায় কৃষিকে প্রাধান্য প্রদান করা হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
লেখক: প্রকল্প পরিচালক, ডিএই এবং কৃষি উন্নয়ন কর্মী
এএন