মো. তানজিমুল ইসলাম
মে ২১, ২০২৬, ০৫:০৪ পিএম
ডিজিটাল সভ্যতার এ ব্যস্ত সময়ে আজকের শিশুদের কথা শোনবার জন্য সুধীজনের সু-দৃষ্টি কামনা করছি। শুধু অভাবগ্রস্ত শিশুরাই নয় বরং অট্টালিকার চার দেয়ালের মাঝে বন্দি শিবিরে বেড়ে ওঠা অভিজাত শিশুদের আক্ষেপের কথাগুলো অনুধাবন করবার জন্যই আজ এই নিবেদন! চুপটি মেরে কেউ থাকবেন না, প্লিজ! আধুনিক মা-বাবাদের বাড়াবাড়ি আচরণে আজ তারা বাকরুদ্ধ! আধুনিক অভিভাবকরা জীবনে যে মনোবাসনা পূরণ করতে পারেননি, সন্তানদের দ্বারা সেটি বাস্তবায়নের জন্য অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেছে আজ তারা দলবেঁধে।
প্রতিটি পরীক্ষার ফল ‘এ’ প্লাস না হলে যেন অভিভাবকত্বের মানহানি ঘটে! উমুক্ত চিন্তার ছেলেমেয়েদের ঐক্য, বাংলার মাটির সোঁদা গন্ধ, বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা, সামাজিক আচার, পারিবারিক বন্ধন, এমনকি পূর্বপুরুষদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা সম্পর্কে এ যুগের ‘এ’ প্লাস প্রাপ্ত শিশুরা অবগত নয়। গরু-ছাগলকে তো বাপ-দাদারাই লালন-পালন করেছে, তাই শিশুদের ডলফিন-ডাইনোসোরকে আবিষ্কার করতে শেখানো হয়। অধিকাংশ শিশুদের কাছে দাদুবাড়ির মানুষ আজ বড্ড অচেনা।
গাঁয়ের কাদামাখা মানুষদের সঙ্গে মিশলে শিশুরা পথভ্রষ্ট হতে পারে ভেবে এ যুগের শিক্ষিত মায়েরা কখনোই তাদের (গাঁয়ের আত্মীয়দের) আদর-স্নেহকে প্রশ্রয় দেন না। অনেক ক্ষেত্রে আদিখ্যেতা ভেবে এড়িয়েও চলেন। বাড়ির দুয়ারে গাছতলায় কিশোর-কিশোরীদের স্বাধীনভাবে চলার-বলার-খেলার কোনো অধিকারই তাদের থাকেনা। সভ্য-শিক্ষিত (পাষাণ) মা-বাবাদের একটাই লক্ষ্য- ইচ্ছে না করলেও খেতে হবে, মন না চাইলেও পড়তে হবে, ভালো রেজাল্ট করতে হবে,....!
পৃথিবীর প্রতিটি মা-বাবা তাদের সন্তানদের ঘিরে বর্ণিল স্বপ্ন বুনতে থাকে অবচেতন মনে।অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়েও সন্তানদের যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য নিজেদের জীবন বাজি রাখতে কেউ কখনো পিছপা হয়না! একই সময়ে কিছু মানুষরূপী জানোয়ার যেন মানব জাতিকে কলঙ্কিত করবার জন্য পাশবিক স্বপ্ন লালন করতে থাকে তাদের শয়নে স্বপনে! এরাও মানুষ! এই বিশাল জনগোষ্ঠীর একটা বিরাট অংশ জুড়ে তাদের অধিপত্য চলতে থাকে হরহামেশায়! গতকাল ঠিক এমনই ঘটনা ঘটে যায় রাজধানী শহরে।
নাটোরের জেলখানা থেকে জামিনে বের হয়ে ঢাকায় আসে জাকির, সঙ্গে তার স্ত্রী স্বপ্না। পেশায় রিকশা মেকানিক। তারা ওঠে পল্লবীর একটি বহুতল ভবনে। জাকিরের নজর পড়ে পাশের ফ্ল্যাটের আট বছর বয়সি শিশু রামিসার ওপর।
প্রতিদিনের মতো আজও বড় বোনের সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার সময় সিঁড়ি থেকে নিখোঁজ হয় রামিসা। শুরু হয় চারদিকে খোঁজাখুঁজি। এক পর্যায়ে উপরের ফ্ল্যাটের সামনে রামিসার একটি জুতা দেখতে পান তার মা। দরজায় নক করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। দরজা ছিল ভেতর থেকে বন্ধ। পরে ৯৯৯-এ কল করে পুলিশ ডাকা হয়। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে রক্তের দাগ দেখতে পায়। পরে খাটের নিচে পাওয়া যায় মাথাবিহীন ছোট্ট একটি দেহ। বাথরুমে পাওয়া যায় খণ্ডিত মাথা। একজন মায়ের সামনে তার সন্তানের এমন বিভৎস দৃশ্য- ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
পুলিশ জাকিরের স্ত্রী স্বপ্নাকে আটক করলে সে জানায়, তার স্বামীর বিকৃত লালসার শিকার হয় রামিসা। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে তাকে হত্যা করা হয়। পরে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে দেহের অংশ আলাদা করে ফেলে দেয়ার পরিকল্পনা করা হয়। আমরা শুধু কয়েকদিন পোস্ট দিয়ে ভুলে গেলে চলবে না। শিশুদের নিরাপত্তা, পারিবারিক সচেতনতা, সামাজিক নজরদারি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
আজ ক্রান্তিবেলায় আমাদের শৈশবকালীন স্মৃতিগুলো খুব নিবিড়ভাবে টানছে। চোখের সামনেই শিশুর প্রতি অত্যাচারের ঘটনাগুলো দেখে বড্ড অসহায় লাগে! শিক্ষার মান উন্নয়নের নামে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেছে আজ ‘শিক্ষক’ নামক জাতির বিবেকরা! নীতি-প্রণেতারা চুপটি মেরে থাকবে কেন..? তারা তো প্রতিবছরই সিলেবাস পরিবর্তন করছেন, কোচিং বন্ধের ঘোষণা দিচ্ছেন।
কালেভদ্রে শিক্ষা ব্যবস্থা পরিদর্শন করছেন, শ্রেণিকক্ষে ডিজিটাল সামগ্রী অনুদান দিচ্ছেন, আরও কত কী....! পক্ষান্তরে, প্রাইভেট/পাবলিক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসমূহ দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিবছর, বেতন বৃদ্ধি করছেন। একই শিক্ষক বিদ্যালয়ে সাধারণ মানের শিক্ষাদান করেন, তারাই আবার প্রাইভেটে বা কোচিং বাণিজ্যে অসাধারণ বণিক বনে যান। সময়ের পরিক্রমায় শিক্ষকের যশ-খ্যাতির সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই...।
অতএব, এবার কোচিং বাণিজ্যে খদ্দের না হয়ে কী উপায় আছে...? কোচিং বিপণনের চাহিদা এতটাই তুঙ্গে যে, আগে এলে আগে আসন বরাদ্দ পাবে, নয়তো....অকারণেই ভুল বলে বিবেচিত হবে অসহায় শিক্ষার্থীর পরীক্ষার উত্তরপত্রসমূহ!
সরকারি তৎপরতায় ইতোমধ্যে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধিসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সরকারি তৎপরতা, ইত্যাদি। কিন্তু শিক্ষার্থীর সংখ্যা আনুপাতিক হারে কমে যাচ্ছে! তবে কী এটি ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের সু-প্রভাব....? যদি তা না হয় তবে সরকারের এই পদক্ষেপসমূহ কাদের জন্য? পক্ষান্তরে, শহুরে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসমূহে উপচেপড়া ভিড়....! অনেক টাকার বিনিময়ে হলেও ভর্তি করানো চাই-ই, চাই! এসব লজ্জাকর প্রতিচ্ছবি দেখবার কী কেউই নেই? একই সঙ্গে শুধু পড়ালেখাই নয় বরং শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি ব্যপকভাবে ভাবিয়ে তুলছে প্রতিটি মহলে।
গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী গত ২০২৫ সালেই অন্তত ৫১৬টি নারীি ও শিশু ধর্ষণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে এবং বর্তমানে অর্থাৎ ২০২৬ সালের এই মাসে অন্তত ৪৮১টি এমন পৈশাচিক ও বর্বর ঘটনা ঘটেছে! গণমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী ‘শতকরা প্রায় ৮৫ ভাগ ক্ষেত্রেই যৌন নির্যাতনকারীরা শিশুদের অতি পরিচিত ও কাছের মানুষ’! কাগজে-কলমে আমাদের দেশে শিক্ষিতের হার বাড়ছে যেমন, ঠিক তেমনিই জানোয়ারের সংখ্যাটি বেজায় উদ্বেগজনক হারে বেড়েই চলেছে! এর শেষ কোথায় কেউ কী জানে? আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউনিসেফের তথ্যমতে, পৃথিবীতে এই মুহূর্তে জীবিত ৩৭ কোটি নারী, অর্থাৎ প্রতি আট জনে একজন নারী ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে গত আট বছরে ৩ হাজার ৪৩৮টি শিশু ধর্ষণের মামলা হয়েছে, ধর্ষণের শিকার হয়েছে আরও বেশি।
এদের মধ্যে অন্তত ৫৩৯ জনের বয়স ছয় বছরের কম। আর সাত থেকে ১২ বছরের মধ্যে আছে ৯৩৩ জন। সম্প্রতি মাগুরার বহুল আলোচিত আট বছরের শিশু আছিয়া কিংবা ঢাকার পল্লবীর ফ্ল্যাটের সাত বছরের রামিসা কেবল রূপাক নাম মাত্র! নাম না জানা কত শিশুই না জানি কত পৈশাচিক নিপীড়নের শিকার হয়ে এই নিষ্ঠুর প্রথিবীতে সংগ্রাম করে যাচ্ছে!
ডিজিটাল অভিভাবকরা হয়তো স্বপ্নের জাল বুনে এভাবে- আনন্দঘন মুহূর্তগুলো বিসর্জন দিয়ে একদিন নিশ্চয়ই তাদের সন্তান অনেক বড় অফিসার হবে...! সেদিনই সার্থক হবে জন্মদান! তারা অনেক বড় অফিসারই হবে বটে! তবে আশঙ্কা হলো আদর-স্নেহ-ভালোবাসা বঞ্চিত অভিমানী শিশুরা জমানো ক্ষোভের বশীভূত হয়ে মা-বাবাকে একদিন বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেবে না তো? কেননা, এ সমাজ থেকে তারা তো মানবিক কোনো শিক্ষা পাচ্ছেইনা, পাচ্ছে সার্টিফিকেট অর্জন করবার অসুস্থ প্রতিযোগিতার শিক্ষা! একদিকে বড় অফিসারের কর্তব্য পালনের ব্যস্ততা অন্যদিকে শৈশব কেড়ে নেওয়ার প্রতিহিংসায় প্রজ্জ্বলিত, ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না স্বয়ং মা-বাবার প্রতি! তাছাড়া চরম বাস্তবতার নিরিখে যে সন্তানকে কখনোই আবেগ স্পর্শ করেনি, তারা কেনই বা অহেতুক আবেগের মূল্য দিতে শিখবে.....?
সোহেল রানা জাকির নামক মানুষরূপী অসংখ্য হায়েনারা কেবল মা-বাবার কোলই শূন্য করছে না, বরং পুরো প্রজন্মকে লজ্জায় অবনত করছে! তবুও এরা মানুষের বেশেই চলে, দাম্ভিকতার সঙ্গেই প্রভাব বিস্তার করে চলে! অসহায় মাতা-পিতারা কেবল নীরবে নিভৃতে দিনাতিপাত করে অবশেষে একরাশ লজ্জা-ঘৃণা-হতাশা নিয়ে ওপারে চলে যায়! এ কেমন সভ্যতা? এ কেমন স্বাধীনতা? এ কেমন সংস্কৃতি আমাদের? শিশুদের আর্তনাদ শোনার জন্য কেউ কি নেই? সুশীল সমাজ!
নীতি-প্রণেতারা! ক্ষমতাশীল বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব! কোথায় আপনারা? আপনাদেরও কী লজ্জা-ঘৃণা-রাগ হচ্ছে না এসব দেখে দেখে? আপনারাও কি চুপটি মেরে থাকবেন? নাকি সব দেখে শুনে হাসবেন কুটিকুটি! তবে স্মৃতিবিজড়িত ‘৪৭, ‘৫২, ‘৬৬, ‘৬৯, ‘৭১, ‘৯০, ‘২৪.... সালগুলো কী কেবলই প্রহসন মাত্র? ধিক, শত ধিক, জাতি হিসেবে বড়ই শরমের! বড়ই অপমানের। আসুন তবে আজ এই বিষণ্ন প্রহরে! হায়েনাদের বিরুদ্ধে সমস্বরে প্রতিবাদ গড়ে তুলি !ছি!ছি!ছি! এক সমুদ্র ঘৃণা, থু, থু, থু, থু, থু......!!!
হে সুশীল সমাজ, এসব শিশুর চরম দুর্গতি থেকে বাঁচানোর জন্য কেউ কি আছেন...? তবে জেগে উঠুন সর্বাগ্রে ঐক্যের মিছিলে। তাদের প্রাণী হিসেবে প্রতিদিন নির্যাতন না করে মানুষ হিসেবে বাঁচতে দিন। তাদের বর্ণিল শৈশব কেড়ে নিয়ে তাদের মনকে বিষিয়ে তুলবেন না, তারা সত্যিকারের মানুষ না হলে দানব হয়ে ধূলিস্মাৎ করে দেবে আপনার, আমার, আমাদের জঞ্জাল সমাজটাকে.....!!!
লেখক : সামাজিক উন্নয়ন ও মানবাধিকারকর্মী
জেএইচআর