ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

মহান পেশার মান রক্ষায় মূলধারার সাংবাদিকদের কঠোর হওয়া জরুরী

হাশেম রেজা

হাশেম রেজা

ডিসেম্বর ৮, ২০২৫, ০৪:৪৩ পিএম

মহান পেশার মান রক্ষায় মূলধারার সাংবাদিকদের কঠোর হওয়া জরুরী

সত্য যখন আপস করে, সাংবাদিকতা তখন মরে যায়, সাংবাদিকরা ভয় পেলে পুরো সমাজ অন্ধকারে ডুবে যায়, ক্ষমতার ভয়ে কলম বন্ধ করলে সাংবাদিকতার মৃত্যু ঘটে, স্বাধীন মতপ্রকাশ, সাংবাদিকদের প্রাণ।

সাংবাদিকতা বিশ্বের প্রাচীনতম এবং সর্বাধিক প্রভাবশালী একটি পেশা। সভ্যতার বিকাশ, গণতন্ত্রের উন্মেষ, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সব ক্ষেত্রেই সাংবাদিকদের অবদান গভীর। একজন প্রকৃত সাংবাদিক শুধু সংবাদ বহনকারী নয়, তিনি জনমানুষের প্রতিনিধি, রাষ্ট্রের জবাবদিহির বাহক, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অদম্য কণ্ঠস্বর এবং সমাজের নৈতিক চেতনার ধারক। এ কারণেই সাংবাদিকতাকে বলা হয়, মহান পেশা। 

দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ এই মহান পেশাটি নানা দিক থেকে আক্রমণ, অবক্ষয় ও সংকটের মুখোমুখি। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো, অপসাংবাদিকতার উত্থান। সাংবাদিক নামধারী এমন এক শ্রেণি তৈরি হয়েছে যারা পেশার নীতি নৈতিকতা ভুলে গিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ, চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইল এবং রাজনৈতিক দালালিতে লিপ্ত। ফলে সাধারণ মানুষের মাঝে সাংবাদিকতার প্রতি আস্থা কমছে। 

একইসঙ্গে সত্যিকারের পেশাদার সাংবাদিকরা সংকটে পড়ছেন, বিব্রত হচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই এখনই সময়, সাংবাদিকতার মহান মর্যাদা রক্ষায় মূলধারার সাংবাদিকদের দৃঢ় হওয়া, ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং কঠোর অবস্থান নেওয়ার।

বাংলাদেশে গত এক দশকে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি অস্বাস্থ্যকর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। যাঁরা পেশাদার প্রশিক্ষণ পাননি, যাঁরা সাংবাদিকতার নৈতিকতা বোঝেন না, যাঁরা সংবাদ সংগ্রহের নামে ভয় ভীতি প্রদর্শন করেন, তারা সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বিপদ হয়ে উঠছেন। এই অপসাংবাদিকরা, সত্য প্রকাশ করে না। তথ্য যাচাই করে না। সংবাদকে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে ব্যবহার করে। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পকেটে ঢুকে পড়ে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে সুবিধা আদায় করে। এর ফলে পুরো সাংবাদিক সমাজ প্রশ্নবিদ্ধ হয়। 

সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না কে সাংবাদিক, কে ভুয়া। মূলধারার সাংবাদিকরা নিজেদের পেশাগত পরিচয়ের জন্যও হুমকির মুখে পড়ে। অপসাংবাদিকতার কারণে শুধু সাংবাদিকতার মর্যাদাই ক্ষুণ্ন হচ্ছে না, দেশের গণতন্ত্র, রাষ্ট্রের জবাবদিহি এবং জনস্বার্থও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ যখন মানুষ সংবাদকে বিশ্বাস করতে পারে না, তখন সত্যের বদলে গুজব, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। এই সংকট থেকে বের হতে হলে প্রথম শর্ত, অপসাংবাদিকদের আলাদা করা এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া।

আজ সাংবাদিকতা যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, তার বড় একটি কারণ হলো সাংবাদিকদের নিজেদের মধ্যে বিভক্তি। একই পেশার মানুষ হওয়া সত্ত্বেও একাধিক সংগঠন, দলীয় প্রভাব, রাজনৈতিক অভিমত, সব মিলিয়ে সাংবাদিকরা এক ছাতার নিচে দাঁড়াতে পারছেন না। এই বিভক্তি কী ঘটায়, সাংবাদিকদের ওপর চাপ প্রয়োগ সহজ হয়। 

সরকার বা রাজনৈতিক ক্ষমতাবানরা সাংবাদিকদের বিভক্ত অবস্থাকে কাজে লাগায়। সাংবাদিকদের পেশাদার সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়ে। অপসাংবাদিকরা পরোক্ষভাবে শক্তি পায়। একটি প্রবাদ আছে, ভাঙা ঘরে শত্রুর বাস। সাংবাদিক সমাজও যদি ভাঙা থাকে, তাহলে তারা কোনোভাবেই পেশাকে রক্ষা করতে পারবে না।

দেশের অ্যাটর্নি জেনারেল ঠিকই বলেছেন, আকাশে যত তারা, আইনে তত ধারা। এই ধারাগুলোর অনেকগুলোই প্রয়োগ হয় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। কারণ, সত্য লেখা অনেক সময় ক্ষমতাসীনদের পছন্দ হয় না। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনেককে বিব্রত করে। জবাবদিহি চাইলে তা কেউ কেউ সহ্য করতে পারে না। স্বাধীন মতপ্রকাশকে কেউ কেউ হুমকি মনে করে। ফলে, কখনো মামলা। কখনো ব্ল্যাকলিস্ট। কখনো বিজ্ঞাপন বন্ধ। কখনো চাপ। কখনো ভয়। এসবই হয়ে ওঠে সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার। 

আর বিপরীতে সাংবাদিকরা বিভক্ত থাকায় তাদের পক্ষে এসব মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলাফল, অনেক সাংবাদিক সত্য লেখা থেকে পিছিয়ে আসেন। তারা মনে করেন, সাহস দেখালে চাকরি যাবে, জীবন যাবে, পরিবার বিপদে পড়বে। এই ভয়ের সংস্কৃতি সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শত্রু। সত্য যখন আপস করে, সাংবাদিকতা তখন মরে যায়।

একজন সাংবাদিকের পরিচয় তার কার্ড নয়, তার লেখা। তার সাহস। তার নৈতিকতা। তার সত্য বলার ক্ষমতা। তিনি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে। বৈষম্যের বিরুদ্ধে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে। মানুষের কণ্ঠস্বরের পক্ষে। যিনি এই পথে হাঁটেন, তিনি প্রকৃত সাংবাদিক। এ কারণে বলা হয়, সাংবাদিকতা পেশা নয়, এটি এক ধরনের সংগ্রাম। সত্যের পক্ষে এই সংগ্রাম যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ গণতন্ত্র বেঁচে থাকবে। সাংবাদিকরা ভয় পেলে, পুরো সমাজ অন্ধকারে ডুবে যাবে।

মূলধারার সাংবাদিকদের জন্য এখন তিনটি বড় দায়িত্ব, অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। যে কেউ এসে প্রেস লেখা ব্যাজ পরে নিজেকে সাংবাদিক দাবি করলে তাকে মেনে নেওয়া যাবে না। পেশার অপব্যবহারকারীদের আলাদা করতে হবে, নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড গড়ে তুলতে হবে। সাংবাদিক সমাজে ঐক্য প্রতিষ্ঠা। 

দল বা মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু সাংবাদিকতার প্রশ্নে সবাইকে একই কাতারে দাঁড়াতে হবে। পেশাকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে ঐক্যই শক্তি। সত্যের পক্ষে নির্ভীক থাকা। যেই সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, সাংবাদিকের কলম সত্যের পক্ষে থাকতে হবে। ক্ষমতার ভয়ে কলম বন্ধ করলে সাংবাদিকতার মৃত্যু ঘটে।

লেখার স্বাধীনতা হারালে সাংবাদিক আর স্বাধীন থাকে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কোনো রাজনৈতিক সুবিধা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার এবং সাংবাদিকতার অস্তিত্বের ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নীতিমালা বদলায়। সাংবাদিকরা বাধার মুখে পড়ে। স্বাধীনভাবে লেখা কঠিন হয়ে যায়। এ অবস্থায় সাংবাদিকরা যদি নিজেরাই পিছু হটে যায়, তাহলে পেশার জায়গা দখল করে নেবে অপসাংবাদিকেরা।

যদি আমরা সাংবাদিকতার মান ফিরিয়ে আনতে চাই, তাহলে সত্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। সাহসী প্রতিবেদনে ফিরতে হবে। লিখতে হবে, দুর্নীতি সম্পর্কে। অবিচার সম্পর্কে। সুশাসন সম্পর্কে। রাষ্ট্রের জবাবদিহি সম্পর্কে। সাধারণ মানুষের অধিকার সম্পর্কে। সাহসী লেখা কখনো কখনো ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে, কিন্তু সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোই সাংবাদিকের মূল পরিচয়। যখন সাংবাদিকরা সত্যের পথে ফিরে আসবেন, পাঠকও তাদের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনবে। আর পাঠকের আস্থা ফিরে এলে সাংবাদিকতার মর্যাদা আবার প্রতিষ্ঠিত হবে।

আজকের দিনে সাংবাদিকতা রক্ষা করতে চাইলে সবচেয়ে জরুরি হলো, মূলধারার সাংবাদিকদের কঠোর ঐক্য। ঐক্যবদ্ধ হলে, অপসাংবাদিকতা প্রতিহত হবে। রাষ্ট্রীয় চাপ মোকাবিলা করা সহজ হবে। পেশার মর্যাদা ফিরবে। মানুষের বিশ্বাস স্থায়ী হবে। দেশের গণমাধ্যম হবে আরও শক্তিশালী। সাংবাদিকতার ইতিহাস বলে, সত্যকে কখনো দমিয়ে রাখা যায় না। সত্য সর্বদা উচ্চস্বরে ফিরে আসে, তবে সেই পথ তৈরি করেন সাহসী সাংবাদিকেরা।

সাংবাদিকতা হঠাৎ করে দুর্বল হয়নি। এটি দুর্বল হয়েছে, অপসাংবাদিকতার কারণে। বিভক্তির কারণে। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে। ভয়ের সংস্কৃতির কারণে। এখন সময় এসেছে মূলধারার সাংবাদিকদের নতুনভাবে জেগে ওঠার। সত্যের কলম ধরুন, সাহসের সঙ্গে লিখুন, অপসাংবাদিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ান, ঐক্যবদ্ধ হোন। তাহলেই, সাংবাদিকতার মর্যাদা ফিরবে। সমাজে আস্থা ফিরে আসবে। মহান পেশাটি রক্ষা পাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি স্বাধীন গণমাধ্যম পাবে। 

একজন সাংবাদিকের সত্য লেখা শুধু তার দায়িত্ব নয়, এটি পুরো জাতির প্রতি তার অঙ্গীকার। সুতরাং এখনই সময়, সত্যের পক্ষে কলম ধরার, স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানোর এবং মহান পেশাটিকে আগামীর পথে এগিয়ে নেওয়ার।

জেএইচআর

Link copied!