আমার সংবাদ ডেস্ক
অক্টোবর ২১, ২০২৫, ১১:৫৯ এএম
মানুষের জীবনপথে আলোর উৎস হলো জ্ঞান ও দিকনির্দেশনা। সেই দিকনির্দেশনা যদি না থাকে, তবে মানুষ পথ হারায়, ন্যায় ও অন্যায়ের সীমারেখা মুছে যায়, সমাজে নেমে আসে অন্ধকার। এই অন্ধকারে আলোকবর্তিকা হয়ে এসেছে আল্লাহর অবতীর্ণ কিতাবসমূহ যেগুলো মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালায়, বিবেককে জাগ্রত করে এবং জীবনের প্রতিটি স্তরে সঠিক পথ দেখায়।
ইসলামের মৌলিক ছয় আকিদার একটি হলো আল্লাহর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান। এটি কেবল মুখের উচ্চারণ নয়, বরং জীবনের দর্শন, নৈতিকতার দিকনির্দেশনা এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রতীক।
কিতাবসমূহে ঈমানের অর্থ ও তাৎপর্য
‘কিতাব’ শব্দের আভিধানিক অর্থ লিখিত কিছু। ইসলামি পরিভাষায় কিতাব বলতে বোঝানো হয়, আল্লাহ তায়ালা যেসব গ্রন্থ বা ওহি তাঁর নবী ও রাসুলদের মাধ্যমে মানবজাতির জন্য নাজিল করেছেন। এসব কিতাবের উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে সঠিক ও ভুলের পার্থক্য শেখানো, আল্লাহর ইবাদত ও বান্দার পারস্পরিক আচরণবিধি নির্ধারণ করা, এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
আল্লাহ বলেন, হে মানুষ! তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এসেছে উপদেশ, অন্তরের রোগসমূহের আরোগ্য, হিদায়াত ও রহমত। (সূরা ইউনুস, আয়াত ৫৭)
অতএব, আল্লাহর কিতাবসমূহ শুধু ধর্মীয় আচার ও অনুষ্ঠানের নির্দেশিকা নয়, বরং তা মানবজীবনের প্রতিটি দিক ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার মূলনীতি নির্ধারণ করে।
আল্লাহর চারটি প্রধান কিতাব
ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী আল্লাহ অনেক নবীর প্রতি ওহি প্রেরণ করেছেন। তবে চারটি প্রধান কিতাব মানবজাতির ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তাওরাত নাজিল করা হয়েছিল নবী মুসা (আ.) এর ওপর। যবুর নবী দাউদ (আ.) এর ওপর। ইনজিল নবী ঈসা (আ.) এর ওপর। আল–কুরআনুল কারিম নবী মুহাম্মদ (সা.) এর ওপর।
তাওরাত ছিল ইসরাইলি জাতির জন্য বিধানমূলক গ্রন্থ, যাতে আইন ও শাস্তির বিস্তারিত দিক তুলে ধরা হয়। যবুরে ছিল হৃদয়ের প্রশান্তি ও আল্লাহর প্রশংসার বাণী। ইনজিলে শিক্ষা দেওয়া হয় দয়া, ক্ষমা ও আত্মার পবিত্রতার। আর কুরআনুল কারিমে রয়েছে সবকিছুর পূর্ণতা একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা।
পূর্ববর্তী কিতাবসমূহ: বিকৃতি ও সত্য হারানোর ইতিহাস
মানবজাতির দুর্বলতা হলো, সে বারবার ভুলে যায়, আবার সে আল্লাহর নির্দেশনা নিজের স্বার্থে বিকৃত করে ফেলে। ইতিহাসে দেখা যায়, পূর্ববর্তী কিতাবগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের হস্তক্ষেপে বিকৃত হয়েছে। তাওরাত ও ইনজিলের বহু অংশে যুক্ত হয়েছে মানবিক ব্যাখ্যা, কর্তৃত্ববাদী মত, কিংবা জাতিগত স্বার্থ।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, অতঃপর তারা আল্লাহর বাণীকে বিকৃত করেছে নিজেদের হাতে, তারপর বলে, এটা আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে। (সূরা আল–বাকারা, আয়াত ৭৯)
এই বিকৃতির কারণেই মানবজাতি বারবার পথভ্রষ্ট হয়েছে। ফলে আল্লাহ তায়ালা পাঠিয়েছেন সর্বশেষ ওহি পবিত্র কুরআন, যা কিয়ামত পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকবে।
আল–কুরআন: সব কিতাবের সমন্বয় ও পূর্ণতা
কুরআন শুধু একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, এটি একটি জীবন্ত সংবিধান। এতে আছে বিশ্বাস, নৈতিকতা, সমাজ, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, পরিবার ও মানবাধিকারের পূর্ণাঙ্গ ধারণা।
আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, আমি তোমার প্রতি এই কিতাব নাজিল করেছি, যা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যতা প্রমাণ করে এবং তাদের উপর সংরক্ষক হিসেবে অবস্থান করে। (সূরা মায়িদা, আয়াত ৪৮)
অর্থাৎ, কুরআন এসেছে সব পূর্ববর্তী কিতাবের সত্য অংশগুলোকে সংরক্ষণ করতে এবং মানবজাতিকে এমন এক জীবনদর্শন দিতে, যা যুগে যুগে প্রাসঙ্গিক থাকবে।
কুরআনের বৈশিষ্ট্য হলো: এটি অপরিবর্তনীয়। একে কেউ বিকৃত করতে পারবে না, কারণ আল্লাহ নিজেই বলেছেন, নিশ্চয়ই আমিই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং নিশ্চয়ই আমিই এর সংরক্ষক। (সূরা হিজর, আয়াত ৯)
কিতাবসমূহে ঈমানের বাস্তব প্রতিফলন
যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে আল্লাহর কিতাবসমূহে ঈমান রাখে, তার জীবনে অহংকার, অন্যায় ও স্বার্থপরতার জায়গা থাকে না। সে অন্যায়ের পাশে নয়, বরং ন্যায়ের পথে দাঁড়ায়।
আল্লাহর কিতাব ও আধুনিক মানবজীবন
আজকের পৃথিবীতে প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, অর্থনীতি সবকিছু দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কিন্তু মানুষ যত এগোচ্ছে জ্ঞানে, তত হারাচ্ছে নৈতিকতার ভারসাম্য। সমাজে বাড়ছে হিংসা, ভোগবাদ, অন্যায় ও নৈতিক অবক্ষয়।
এই অস্থির পৃথিবীতে কুরআনের শিক্ষা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কারণ এটি কেবল অতীতের নয়, ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাও দেয়। এতে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই এই কুরআন সেই পথ প্রদর্শন করে, যা সবচেয়ে সঠিক। (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৯)
অতএব, যদি মানুষ আবার কুরআনের দিকে ফিরে আসে, তবে সে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথও পাবে এবং সমাজ পাবে স্থায়ী শান্তি।
আল্লাহর কিতাবের প্রতি ঈমান: ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রভাব
আল্লাহর কিতাবে ঈমান আনা শুধু আধ্যাত্মিক প্রশান্তি দেয় না, এটি গড়ে তোলে দায়িত্বশীল নাগরিক ও ন্যায়ের সমাজ।
ব্যক্তিগত জীবনে এর প্রভাব: হৃদয়ে জাগে আল্লাহভীতি, কাজের মধ্যে আসে সততা, দুঃখ কষ্টে আসে ধৈর্য।
সমাজে এর প্রভাব: অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, দুর্নীতির প্রতি শূন্য সহনশীলতা, সামাজিক বন্ধনে ঐক্য ও সহমর্মিতা।
কুরআনের ভাষায় নিশ্চয়ই যারা কিতাবে ঈমান আনে এবং তা ধারণ করে, তাদের জন্য রয়েছে অফুরন্ত প্রতিদান। (সূরা আল–আনকাবুত, আয়াত ৪৯)
আল্লাহর কিতাবসমূহ মানবজাতির জন্য আল্লাহর করুণার বার্তা। এ কিতাবগুলো শেখায়, মানুষ যেন অন্ধ আনুগত্য নয়, যুক্তি ও বিবেকের আলোয় জীবন পরিচালনা করে।
আজ যখন পৃথিবী জুড়ে নৈতিক অবক্ষয় ও দিশাহীনতা, তখন একমাত্র কুরআনের শিক্ষা-ই মানুষকে ফেরাতে পারে ন্যায়ের পথে। আল্লাহর কিতাবসমূহে ঈমান আনা মানে, সত্যকে মেনে নেওয়া, অন্যায়কে প্রত্যাখ্যান করা, এবং আল্লাহর নির্দেশে জীবন পরিচালনার প্রতিজ্ঞা।
সুতরাং, যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবে বিশ্বাস রাখে ও তার অনুসরণে জীবন সাজায়, সে-ই প্রকৃত সফল, আল্লাহর প্রিয় বান্দা। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর কিতাবসমূহে ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, তার জন্য রয়েছে জান্নাতের আনন্দময় প্রতিদান। (সূরা নিসা, আয়াত ১২২)
জেএইচআর