আমার সংবাদ ধর্ম ডেস্ক
জুলাই ৬, ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম
নারী-পুরুষের পবিত্র ও বৈধ সম্পর্কের একমাত্র হালাল মাধ্যম বিয়ে। আর বিয়ের অন্যতম এক আবশ্যিক অনুষঙ্গ হলো দেনমোহর। দেনমোহর নারীর অধিকার এবং তা পরিশোধ করা ইসলামের স্পষ্ট বিধান। এটি কেবল খাতাকলমে একটি বড় অঙ্ক লিখে রাখার নাম নয়, বরং তা স্ত্রীকে অবশ্যই বুঝিয়ে দিতে হবে।
ইসলামী শরিয়তে বিয়ের জন্য দেনমোহর অপরিহার্য। এটি কোনো দয়া বা দান নয়, বরং স্ত্রীর ওপর আল্লাহর দেওয়া এক অকাট্য অধিকার। মোহর পরিশোধ না করা পর্যন্ত স্ত্রী নিজেকে স্বামীর থেকে দূরে রাখার অধিকারও রাখে। মূলত মোহরানা হলো সতীত্বের সম্মান, পবিত্র বন্ধনের দায়বদ্ধতা এবং নারীর ভবিষ্যৎ জীবনের এক ধরনের সামাজিক গ্যারান্টি। এটি কোনো অর্থ-বিত্তের প্রতিযোগিতা নয়, বরং স্বামীর ওপর অবধারিত এক কর্তব্য।
মোহর নির্ধারণের দায়িত্ব মূলত বর-কনে এবং তাঁদের অভিভাবকদের। আমাদের সমাজে সাধারণত উভয় পক্ষের মুরুব্বিরা মিলে এটি ঠিক করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো সর্বোচ্চ সীমা ইসলামে ঠিক করে দেওয়া হয়নি। তবে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী সর্বনিম্ন মোহর হলো ১০ দিরহাম (যা ৩০.৬১৮ গ্রাম রুপা বা এর সমপরিমাণ অর্থ)। হাদিস শরিফে এসেছে, “দশ দিরহামের কম কোনো মোহর নেই।” (বায়হাকি)
অবশ্য ইসলামের শুরুর দিকে অসচ্ছলতার কারণে একদম নিঃস্ব এক সাহাবিকে পবিত্র কোরআন শেখানোর বিনিময়ে বিয়ে দিয়েছিলেন আল্লাহর রাসুল (সা.)। তিনি বলেছিলেন, “কোরআনের যা কিছু তোমার জানা আছে, তা স্ত্রীকে শিক্ষা দেবে; এর বিনিময়ে আমি মেয়েটিকে তোমার কাছে বিয়ে দিলাম।” (মুসনাদে আহমদ)
সামর্থ্যবান স্বামী চাইলে স্ত্রীকে বেশি পরিমাণে মোহর দিতে পারেন, তাতে ইসলামে কোনো বাধা নেই। তবে তা যেন কোনোভাবেই লোকদেখানো বা অহংকারবশত না হয়। কারণ ইসলামে লোকদেখানো আমল বা লৌকিকতাকে ছোট শিরকের সমতুল্য বলা হয়েছে। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা সবসময় এক রকম থাকে না, তাই মোহরের পরিমাণ স্বামীর সামর্থ্য, স্ত্রীর সামাজিক মর্যাদা এবং পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সর্বোত্তম পরিমাণের মোহর হচ্ছে তা, যা পরিশোধ করা সহজসাধ্য।”
লোকদেখানো লৌকিকতা কিংবা ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে অস্বাভাবিক বেশি দেনমোহর ধার্য করাকে ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলামী শরিয়তে যৌতুক নেওয়া যেমন পুরোপুরি অবৈধ, তেমনি মোহরের জন্য বরপক্ষকে অতিরিক্ত চাপ দেওয়াও যুক্তিসঙ্গত নয়। সহজ ও অনাড়ম্বর বিয়ে প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “নিশ্চয় বরকতের দিক দিয়ে সর্বোত্তম ও গ্রহণযোগ্য বিয়ে হলো, যে বিয়ে সবচেয়ে স্বল্প খরচে সম্পাদিত হয়।” (বায়হাকি)
জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগে মোহরানা নিয়ে বর ও কনেপক্ষের মধ্যে ব্যাপক দরকষাকষি হতো এবং মাত্রাতিরিক্ত মোহর ধার্য করা হতো। পরবর্তী সময়ে তা আদায় নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ ও নানা জটিলতা তৈরি হতো। বর্তমান মুসলিম সমাজের চিত্রও অনেকটা একই রকম। মোহরের প্রকৃত গুরুত্ব ভুলে এটিকে এখন স্রেফ একটি আনুষ্ঠানিক রীতিনীতিতে পরিণত করা হয়েছে।
ইসলামী শরিয়তে স্ত্রীর মোহর পরিশোধ করা স্বামীর ওপর ওয়াজিব করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, “তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের থেকে যে স্বাদ গ্রহণ করো, তার বিনিময়ে অপরিহার্য ফরজ হিসেবে তাদের মোহর পরিশোধ করো।” (সূরা নিসা: ২৪)
অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিয়ের সময় বিশাল অঙ্কের মোহর ধার্য করলেও মনে মনে তা পরিশোধের নিয়তই থাকে না। কেবল প্রচারের উদ্দেশ্যেই তা করা হয়। এ ধরনের মানসিকতা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো একটা পরিমাণ মোহরানা ধার্য করে কোনো নারীকে বিয়ে করল, অথচ আল্লাহ জানেন তা পরিশোধ করার ইচ্ছে তার নেই, এ ব্যক্তি আল্লাহর নামে তার স্ত্রীকে প্রতারিত করল এবং অন্যায়ভাবে তার সতীত্ব নিজের জন্য হালাল মনে করে ভোগ করল; এমন ব্যক্তি কিয়ামতে ব্যভিচারী হিসেবে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে।” (মুসনাদে আহমদ)
আমাদের সমাজে দেনমোহরের ক্ষেত্রে ‘মোহরে ফাতেমি’র বেশ প্রচলন রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর প্রিয় কন্যা হজরত ফাতিমা (রা.)-এর বিয়ের সময় যে পরিমাণ মোহর নির্ধারণ করেছিলেন, সেটিকে মোহরে ফাতেমি বলা হয়। এর পরিমাণ ছিল ৫০০ দিরহাম, যা বর্তমান হিসাব অনুযায়ী ১৫৩০.৯ গ্রাম রুপার সমতুল্য।
বিয়ে হলো একটি পবিত্র আত্মিক বন্ধন, মানব বংশবৃদ্ধির চিরায়ত প্রক্রিয়া এবং চরিত্র হেফাজতের মোক্ষম উপায়। তাই সামর্থ্য থাকলে বিয়ে সহজ করার বিকল্প নেই। একটি শান্তিময় সমাজ গঠনে আমাদের উচিত দেনমোহরের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি পরিহার করে বিয়ের সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে সহজ ও প্রাণবন্ত করে তোলা।
জেএইচআর