ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

জনদুর্ভোগের বৃষ্টি: জলাবদ্ধতায় নাজেহাল নগরবাসী

রুহেল হাশেমী

রুহেল হাশেমী

অক্টোবর ১০, ২০২৫, ০৬:১৯ পিএম

জনদুর্ভোগের বৃষ্টি: জলাবদ্ধতায় নাজেহাল নগরবাসী

অক্টোবর মাস, ক্যালেন্ডার বলছে শরতের শেষভাগ। শীতের আগমনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে দেশের উত্তরাঞ্চলে। অথচ প্রকৃতি যেন নিজের তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। ঘন কালো মেঘে ঢেকে যাচ্ছে আকাশ, একটানা বৃষ্টি যেন থামার নামই নিচ্ছে না। সকাল-বিকেল-রাত—যখনই বাইরে বের হওয়া হোক, সঙ্গী হচ্ছে ছাতা, কাদামাটি, জলজট আর যানজট।

এই অস্বাভাবিক বৃষ্টিতে দেশের নগরজীবন থেকে শুরু করে গ্রামীণ জনজীবন পর্যন্ত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই পানি জমার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গুলশান, মালিবাগ, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আজিমপুর ও পুরান ঢাকাসহ সব এলাকায় রাস্তায় হাঁটুসমান পানি জমে নগরবাসীর ভোগান্তি তৈরি হয়েছে।

রাজধানীর বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, ‘সকালে বাজারে বের হয়েছি, বৃষ্টি পড়ছিল টিপটিপ করে। আধা ঘণ্টার মধ্যে রাস্তাটা নদীতে পরিণত হলো। রিকশাও চলে না, পায়ে হেঁটে যাওয়াই একমাত্র উপায়। শীত আসছে কিন্তু গরমে ভেজা জামাকাপড় শুকাচ্ছে না, সবসময় একটা অস্বস্তি।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা জলাবদ্ধতার বিষয়টি স্বীকার করে বলেছেন, “ড্রেনেজ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে পানি দ্রুত নিষ্কাশন সম্ভব হচ্ছে না। এমন বৃষ্টি সাধারণত বর্ষাকালে দেখা যায়, কিন্তু অক্টোবরেও তা অব্যাহত থাকায় জনভোগান্তি বাড়ছে।”

বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন দিনমজুর, রিকশাচালকরা। দিন এনে দিন খায় যারা তাদের জন্য বৃষ্টির প্রতিটি ঘণ্টা মানে ক্ষতির হিসাব।

রিকশাচালক আবদুল কুদ্দুস বলেন, “বৃষ্টি শুরু হলেই যাত্রী কমে যায়। আবার পানি জমলে রিকশা টানাও যায় না। ভিজে গিয়ে ঠাণ্ডা লাগে, কিন্তু ঘরে তো বসে থাকা যায় না। না বের হলে খাওয়া জুটবে কীভাবে?

শুক্রবার সকাল থেকে থেমে থেকে ঢাকায় বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টিতে ভোগান্তিতে পড়েছেন বিসিএস পরীক্ষার্থী, পথচারী ও শ্রমজীবী মানুষরা।

আজ ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের (শিক্ষা) প্রিলিমিনারি পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর পরীক্ষার্থী ও তাদের স্বজনদের ভিজে ভিজে গন্তব্যে যেতে দেখা গেছে।

ইডেন কলেজে পরীক্ষা দেওয়া পরীক্ষার্থী হাফিজুর রহমান জানান, সকাল থেকে আকাশটা মেঘলা ছিল। ভাবিনি বৃষ্টি হবে। পরীক্ষা দিয়ে বের হয়েই বৃষ্টিতে ভিজে গেছি।

পাবনা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, নরসিংদী, বরিশাল, খুলনা সব এলাকাতেই একই অবস্থা। শহরের রাস্তায় কাদা, বাজারে পানি, পাড়া-মহল্লায় ড্রেন উপচে পড়ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি অক্টোবর মাসে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে, তা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ এবং মৌসুমি বায়ুর অস্বাভাবিক সক্রিয়তার কারণে এই অতিবৃষ্টি হচ্ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মনোয়ার হোসেন বলেন, এই সময়ে সাধারণত মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বৃষ্টিপাত কমে আসে। কিন্তু এ বছর দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে বারবার নিম্নচাপ তৈরি হচ্ছে, যা স্থলভাগে উঠে এসে বৃষ্টি নামাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এখানে অস্বীকার করা যায় না।”

তিনি আরও যোগ করেন, “এভাবে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষা-ধারার বিস্তারকে আমরা ‘বর্ধিত বর্ষাকাল’ বলি। এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।”

শুধু শহর নয়, গ্রামেও বৃষ্টির প্রভাব তীব্র। ফসলের মাঠ ডুবে গেছে, কাঁচা রাস্তা কাদা-পানিতে অচল। অনেক কৃষক ভয় পাচ্ছেন আগাম ধানের ক্ষতি হবে কী না।

ফরিদপুরের কৃষক আজহার মোল্লা বলেন, “ধান কাটার সময় আসছে। কিন্তু মাঠে এখনো পানি, ধান পড়ে আছে কাদায়। যদি দুই-একদিনের মধ্যে রোদ না আসে, তাহলে অনেক ধান পচে যাবে।”

বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী এলাকায় শীতের সবজির বীজতলা ভেসে গেছে। চাষিরা নতুন করে চারা তুলতে পারছেন না। নদী তীরবর্তী এলাকায় আবার নদীর পানি বেড়ে নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে।

অবিরাম বৃষ্টির কারণে ডেঙ্গু, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া ও ত্বকজনিত রোগ বেড়েছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

রাজধানীর মুগদা হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক ডা. সুমাইয়া ইসলাম বলেন, “অবিরাম বৃষ্টির কারণে বাতাসে আর্দ্রতা বেড়েছে, যা ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বাড়ায়। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, জ্বর, সর্দি, এমনকি ডেঙ্গুর নতুন কেসও বাড়ছে।”

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নাগরিকদের সতর্ক থাকতে বলেছে। বিশুদ্ধ পানি পান, মশারি ব্যবহার ও বৃষ্টির পানি জমতে না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

প্রতিবার বৃষ্টির পরই নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা চোখে পড়ে। ঢাকার ড্রেনগুলোতে বর্জ্য জমে, পানি নামার পথ বন্ধ হয়ে যায়। বৃষ্টির পানি জমে রাস্তা ভাসে, ঘরবাড়িতে পানি ঢোকে।

রাজধানীর কল্যাণপুরের বাসিন্দা নাসিমা আক্তার বলেন, “বৃষ্টি শুরু হলে মনে হয় নদীর পাড়ে আছি। আমাদের বাসার নিচতলায় পানি ঢোকে, আসবাবপত্র নষ্ট হয়। কতবার অভিযোগ করেছি, কেউ আসে না।”

নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আদনান রউফ বলেন, “ঢাকা শহর এখন আর প্রাকৃতিকভাবে পানি নিষ্কাশন করতে পারে না। জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ আর খাল দখল এই সংকটকে বাড়িয়ে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই দুর্ভোগ আরও ঘন ঘন হবে।”

তবে এই ধারাবাহিক বৃষ্টিরও কিছু ইতিবাচক দিক আছে। অনেক এলাকার পানির স্তর কিছুটা উন্নত হয়েছে, তাপমাত্রা কমে গিয়ে গরমের অস্বস্তি দূর হয়েছে। কিন্তু এই সামান্য স্বস্তির ভেতরও ঘনীভূত আছে দুর্ভোগের দীর্ঘ ছায়া।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অস্বাভাবিক আবহাওয়া শুধু প্রাকৃতিক কারণ নয়, মানবসৃষ্ট সংকটও। তারা কয়েকটি করণীয় উল্লেখ করেছেন। যেমন, দ্রুত ড্রেন ও খালগুলো পরিষ্কার রাখা, জলাশয় ও প্রাকৃতিক পানি ধারণ এলাকা রক্ষা করা, জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, স্থানীয় সরকারকে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা ও নগর পরিকল্পনায় বৃষ্টিপাতের নতুন ধারা বিবেচনায় আনা।

ইএইচ

Link copied!