Amar Sangbad
ঢাকা শনিবার, ২০ জুলাই, ২০২৪,

রহস্যাবৃত ছকে বিএনপি

আবদুর রহিম

নভেম্বর ২৭, ২০২৩, ১১:৩৮ পিএম


রহস্যাবৃত ছকে বিএনপি
  • বিরোধীদের আত্মরক্ষা বার্তার সম্ভাবনা 
  • অর্থনীতিতে বিশেষ চাপের স্বপ্ন দেখছে বিএনপি   
  • ৩২ দিন পর আজ প্রেস ক্লাবে প্রকাশ্যে আসবেন বিএনপির সিনিয়র নেতা ও পরিবারের সদস্যরা  
  • আজ চরমোনাইয়ের জাতীয় সংলাপ বিএনপির শীর্ষ নেতারা ছাড়াও বহু রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে
  • নানা অশুভ গুঞ্জন রাজনীতিপাড়ায়, ফের বুধবার অবরোধ ও বৃহস্পতিবার হরতালের ডাক

এখন বিরোধীদের নির্বাচন অসম্ভব, তাদের সব নেতাই জেলে-সাজায়
—বদিউল আলম মজুমদার সম্পাদক, সুজন

নির্বাচন হওয়া-না হওয়া নিয়ে পরিস্থিতি অনিশ্চিত স্থগিতও হতে পারে
—মহিউদ্দিন আহমেদ
রাজনীতিক ও ইতিহাসবিদ

টর্নেডো গতিতে মহাবিপদে সিংহাসন পতন আতঙ্কে ভুয়া নাটকের উদ্ভাবন
—রুহুল কবির রিজভী
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বিএনপি

টানা ৩২ দিন আত্মগোপনে বিএনপি। দলটিতে চলছে সরকারের গণহারে দমন-পীড়ন। নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী এবং মাঠপর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের এ পর্যন্ত ২৯টি মামলায় ৯ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৫২৬ জন নেতাকর্মী বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৯ হাজার ৯৯১ জন। মামলা ৮২৮টি। আসামি ৭১ হাজার ৯৮৮ জন। মোট মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলছে , ৬৮টি জেলখানা জেলখানায় ধারণক্ষমতার বাইরে বেশি নেতাকর্মী অবস্থান করছে। কারাগারে স্বাস্থ্যঝুঁকির কথাও বলছেন অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার তফসিল ঘোষণা করেছে। গত রোববার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ২৯৮ জন চূড়ান্ত প্রার্থীও ঘোষণা করেছে। দেশের রাজনীতি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী দ্বাদশ সাংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অর্থনৈতিক ঝুঁকির সঙ্গে দেশের রাজনীতিও মহাবিপদে পড়তে যাচ্ছে। স্বয়ং নির্বাচন কমিশনারও বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে না এলে দেশের জন্য বিপদ রয়েছে। বিএনপির নীতি-নির্ধারণী ফোরামে সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার তারা ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাবে না। 

এ বিষয়ে তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। নির্বাচনের আগে-পরে করণীয় বিষয় কী হতে পারে— এটি তারা নির্দিষ্ট ছক একেই এগোচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলটির নীতি-নির্ধারণী দুই নেতা আমার সংবাদকে বলেন, ‘দেখুন সরকারকে ভারতসহ দু’-একটি দেশ সাপোর্ট দিচ্ছে বলেই আজ বিএনপির প্রধান কার্যালয়ে তালা দেয়া হয়েছে, নেতাকর্মীদের আটক করেই সাজা দিয়ে দেয়া হচ্ছে যাতে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারে, বিচার বিভাগকে যে সরকার দলীয়করণ করে ফেলেছে, তা দিনে-রাতে সাজার মাধ্যমে প্রমাণ হয়ে গেছে। বিএনপি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছে কোনো যানবাহন ভাঙচুর করছে না আগুন দিচ্ছে না, কারা করছে তারা ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে কূটনৈতিকদের জানিয়েছে। সরকার যেমন কিছু দেশের প্রেসক্রিপশনে একতরফাভাবে এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক, একইভাবে বিএনপিও কিছু কুটনৈতিক ভায়োলেন্স রক্ষা করেই চলছে। পরিবেশ পরিস্থিতির আলোকে তারা তা বাস্তবায়ন করবে। 

রাজনৈতিক কয়েকটি সূত্র বলছে, বিএনপি আসলে হাওয়াই স্বপ্ন দেখছে। তারা ধারণা করছে, যুক্তরাষ্ট্র এখন থেকে  আর রিয়্যাক্ট করবে না। যা করবে সব অ্যাক্ট। ক্ষমতাসীন আ.লীগকে সন্ত্রাসী দল বলতে পারে। বিরোধীদের আত্মরক্ষার কথা বলতে পারে। অর্থনীতির নানা বিষয়ে চোখ রাঙাতে পারে, রিজার্ভসহ সব ব্লক করে দিতে পারে। অর্থনীতিতে গুরুতর প্রভাব ফেলবে। কারণ ওয়াশিংটন ডিসি যে পদক্ষেপই গ্রহণ করুক না কেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপ সেটি  অনুসরণ করবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা থাকলে অর্থনীতি  ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পুলিশ, বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। বিশ্বের ক্ষমতাধর কিছু ব্যক্তির অশুভ পরিণতির শঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। এ সমস্ত হিসাবে করেই বিএনপি কৌশলগতভাবে এগোচ্ছে। দলটির কেউ কেউ বলছে, বিএনপির আত্মগোপনে থাকাও সরকারের জন্য একটি ফাঁদ। এত দিন বিএনপি বিদেশিদের কাছে যে অভিযোগগুলো করে আসছে, গত এক মাসে তা প্রমাণ হয়ে গেছে। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২৮ অক্টোবর থেকে আত্মগোপনে বিএনপির নেতারা। আসেনি প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচিতে। আজ বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে দলটির সিনিয়র সিনিয়র নেতারা ও পরিবারের সদস্যদের মানববন্ধন কর্মসূচি আছে, সেখানে তারা আজ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিশেষ বার্তা দেবেন। এ ছাড়া বিদ্যমান সংকটময় পরিস্থিতিতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের উদ্যোগে রিপোর্টার্স ইউনিটির নসরুল হামিদ মিলনায়তনে রাজনৈতিক দল, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও বিভিন্ন পেশাজীবী প্রতিনিধিদের সাথে আজ জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম পীর সাহেব চরমোনাই। এ কর্মসূচিতে বিএনপির সিনিয়র নেতারা অংশগ্রহণ করবে। এখানে কিছু চমক থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বুধবার অবরোধ ও বৃহস্পতিবার হরতালের ডাক বিএনপির : এবার একসঙ্গে অবরোধ ও হরতালের কর্মসূচি দিয়েছে বিএনপি। আগামী বুধবার সকাল ৬টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টা অবরোধ কর্মসূচি পালন করবে দলটি। আর পরের দিন বৃহস্পতিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে দলটি। গতকাল সোমবার বিকেলে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। ধারাবাহিকভাবে এই কর্মসূচি চলতে থাকবে। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘জনগণের চাওয়া-পাওয়া উপেক্ষা করে শেখ হাসিনা আবারো ২০১৪ কিংবা ২০১৮ সালের মতো আওয়ামী লীগ এবং ফ্যাসিবাদের দোসর খুদ-কুটে খাওয়া কতিপয় সুবিধাবাদী রাজনীতিককে নির্বাচনে দাঁড় করাতে বর্তমান ফ্যাসিস্টদের আস্তানা গণভবনে এমপি পদ বণ্টনের হাট বসিয়েছে। মাফিয়া চক্রের রাবারস্ট্যাম্প কাজী আউয়াল বাহিনী নির্বাচনি নাটকের নামে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে শেখ হাসিনার তৈরি করা এমপি তালিকায় বৈধতার সিলমোহর দেয়ার অপতৎপরতায় লিপ্ত। আতঙ্কিত প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল গতকাল সোমবার বলেছেন, ‘বিদেশি শক্তির থাবা পড়েছে বাংলাদেশে। তাদের থাবা থেকে দেশের অর্থনীতি ও পোশাক শিল্পকে বাঁচাতে হলে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হবে। গ্রহণযোগ্য ভোট করতে না পারলে বিপদ।’ টর্নেডোর গতিতে ধেয়ে আসা এই মহাবিপদে সিংহাসন পতনের আতঙ্কে ভুয়া নির্বাচনের নতুন নাটক উদ্ভাবন করেছে। কারণ তারা বুঝে গেছে, বিএনপি ছাড়া নির্বাচন তাদের সিংহাসন টিকবে না। আর বিএনপিও এই হাসিনা সরকারকে আর বৈধতা দিতে তাদের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। 

সুশাসনের জন্য নাগরিক বদিউল আলম মজুমদার আমার সংবাদকে বলেছেন, ‘সরকার জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন করতে বদ্ধপরিকর। এটি দিনের আলর মতো পরিষ্কার যে আরেকটি একতরফা নির্বাচন হচ্ছে। এখন বিভিন্ন মহল থেকে সংলাপের কথা বলা হচ্ছে। তারাও নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপের বসার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।’ 

তিনি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে এখন বিরোধীরা চাইলেও নির্বাচন করতে পারবে না। কারণ, তাদের সব নেতাই এখন জেলে। ইতোমধ্যে অনেকের সাজা হেয়েছে, আরও অনেকে দণ্ডিত হবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, একতরফা নির্বাচনই নিয়তি।’ 

রাজনৈতিক ও ইতিহাসবিদ মহিউদ্দিন আহমেদ একটি বিশেষ প্রবন্ধে বলেছেন, ‘নির্বাচন হওয়া না হওয়া নিয়ে পরিস্থিতি খুবই অনিশ্চিত। যেকোনো সময় যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। নির্বাচন স্থগিতও হতে পারে। বাংলাদেশের নেতারা এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, ভারত ও চীনের নেতাদের মধ্যে পর্দার আড়ালে কী ঘটছে তা আমরা জানি না। নির্বাচন আগামী বছরের জানুয়ারিতে হওয়ার কথা। ধারণা করছি, কয়েক সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা যেতে পারে, তবে অনির্দিষ্টকালের জন্য নয়, কারণ সেখানে একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যদি না জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। বিগত নির্বাচনগুলোতে ভোটার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। সামপ্রতিক উপনির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮ শতাংশ। আমি ধারণা করি এবারও ভোটার কম হবে এবং যদি ভোট সঠিকভাবে গণনা করা হয়, তাহলে তা ১৫-২০ শতাংশের বেশি হবে না। বাংলাদেশের মানুষ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চায় এবং বর্তমান সরকারের প্রতি অনেক  মানুষ বিরক্ত। ১৫ বছর পর তারা শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন চায়। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে।
 

Link copied!