Amar Sangbad
ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ, ২০২৪,

নির্বাচনি সহিংসতার শঙ্কা

মো. মাসুম বিল্লাহ

মো. মাসুম বিল্লাহ

ডিসেম্বর ১১, ২০২৩, ১২:১০ এএম


নির্বাচনি সহিংসতার শঙ্কা

নির্বাচনে সহিংসতার বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যায় না
—ড. খ. মহিদ উদ্দিন, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, ডিএমপি

নির্বাচনে সহিংসতার আশঙ্কা প্রবল, যথেষ্ট পরিমাণে অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ ঘটেছে
—ড. তৌহিদুল হক
সহযোগী অধ্যাপক সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ, ঢাবি

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক উত্তাপ ততই বাড়ছে। প্রার্থী চূড়ন্ত না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় নির্বাচনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নানা অপরাধের আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। নির্বাচন ঘিরে সক্রিয় হচ্ছে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ক্যাডার বাহিনীর সদস্যরা। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যতটা আনন্দের অনুভূতি জাগে, তার চেয়ে বেশি জাগে ভয়ের অনুভূতিও। আর এ ভীতি হলো নির্বাচনকালীন ও তার পরবর্তী সহিংসতা, লুটপাট, চাঁদাবাজি, মাদকের আসর, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, ঘরবাড়ি-দোকানপাট, ভিটেমাটিতে অগ্নিসংযোগের। দেশে নির্বাচনকালীন ও তার পরবর্তী সহিংসতা যেন ক্রমেই স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। গত ১১ টি নির্বাচন ও নির্বাচনকালীন সহিংসতার চিত্র দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। নির্বাচনকালীন সহিংসতা বন্ধে কোনো রাজনৈতিক দল কখনো কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি, এমনটিই মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। অনেকেই বলেন, ‘এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে!’ বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন ও পরবর্তী সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেই— এমনটি অস্বীকার করা যায় না। কোনো দলই নির্বাচনি ইশতেহারেও এ ব্যাপারে কিছু উল্লেখ করে না।

সূত্র মতে, গত একাদশ জাতী??য় সংসদ নির্বাচনে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর দিন থেকে নির্বাচন শেষ হওয়া পর্যন্ত ২১ দিনে সারা দেশে ২২ জন নিহত ও ২১৭৯ জন আহত হয়েছিলেন। শুধু ভোটের দিন সহিংসতায় ২১ দিনকে ছাড়িয়ে ওই ২৪ ঘণ্টায় ১৭ জন নিহত ও ৪৭ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। অতীতে নির্বাচনকালীন সহিংসতায় নিহত কিংবা নির্যাতনের শিকার হওয়া কেউই বিচার পাননি। এ ছাড়া অনেকেই প্রতিপক্ষের হামলায় বাড়িঘর হারিয়ে সীমাহীন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কিন্তু সেসব ঘটনারও তেমন কোনো বিচার হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা অসম্ভব। 

অনেক নেতা বলেন, পূর্বশত্রুতার কারণে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে নির্বাচনকে মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নিয়ে এ ধরনের সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে অনেক অপরাধী। প্রকৃতপক্ষে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ক্ষয়ক্ষতি ঠিক কত তা নিশ্চিত হওয়ায়ও যাচ্ছে না। কারণ, এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান কোথাও নেই। কেবল বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এ সংক্রান্ত আংশিক খবর জানা যায়। প্রতিবারই দেখা যায়, জাতীয় নির্বাচনের পর প্রভাবশালী দল কর্তৃক প্রতিপক্ষ দলের নেতাকর্মীদের জন্য এক ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। এ কারণে অনেকে গ্রাম ছেড়ে কিংবা কেউ দেশ ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। তাই এবার নির্বাচনের পর প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

নির্বাচনি প্রচারণাকালে জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থীদের ওপর হামলার কথা আগে খুব একটা শোনা না গেলেও গত নির্বাচনি প্রচারণার সময় বেশ কয়েকজন প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। তাই নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে আরও সহিংস ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনসভায় নেতারা যেভাবে প্রতিহিংসামূলক বক্তব্য দিয়েছেন তাতে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বেশি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। 

দেশের বুদ্ধিজীবীরা মনে করেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি স্থাপনে বাংলদেশি শান্তিরক্ষী বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তা ছাড়া বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। এ অবস্থায় নির্বাচনি সহিংসতা থেকে বেরিয়ে আসাটা খুবই জরুরি। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে যারা সরকার গঠন করবেন তাদের বুঝতে হবে, তারা যখন সরকার গঠন করেন তখন সেটি রাষ্ট্রের সরকার হিসেবে বিবেচিত হয়, নির্দিষ্ট কোনো দলের নয়। সুতরাং দেশের প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তায়। তাই এ অপরাধ দমনে সরকারকে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিতে হবে।

এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার, ডিএমপি ড. খ. মহিদ উদ্দিন আমার সংবাদকে বলেন, ‘আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার বিষয়টি উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে তারা মাঠে কাজ করছে। কেউ আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে তাদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা প্রসঙ্গে আমার সংবাদকে বলেন, ‘অতীতের নির্বাচনের চেয়ে বর্তমান দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহিংসতা বহুগুণে বেশি হবে। নির্বাচনের আগে ও পরে প্রবল সহিংসতার সম্ভাবনা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য মতে, বর্তমানে দেশে ভালো পরিমাণে অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ ঘটেছে। যার ফলে বড় ধরনের সহিংসতার সম্ভাবনা রয়েছে।’ 

তিনি আরও বলেন, নির্বাচনি মাঠে পছন্দের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে নানা ধরনের ত্রাস সৃষ্টি করবে একটি মহল। এটি করতে গিয়ে খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, লুটপাট, মাদকের আসর, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, ঘরবাড়ি-দোকানপাট ও ভোটকেন্দ্রে হামলা, ভিটেমাটিতে অগ্নিসংযোগের মতো অপরাধ সংঘঠিত হবে। এই নির্বাচনে যেহেতু সরকারি দল তার দলীয় মনোনীত প্রার্থীর পাশাপাশি ডামি প্রাথীকে সমর্থন করছে, তাই তাদের নিজেদের মধ্যে অন্তঃকোন্দল দেখা দেয়ার শঙ্কাও রয়েছে। যেহেতু জাতীয় নির্বাচন তাই কেউ কাউকে ছাড় দেবে না, নিজেদের মধ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়বে। পাশাপাশি ছোট ছোট কিছু দল যারা নির্বাচনে আসছে তারাও দ্বিধায় থাকবে তাদের আসন ভাগাভাগি ও নির্বাচনে জয়ী হওয়ার প্রতিযোগিতা নিয়ে। 

অন্য দিকে, দেশের বৃহত্তর কয়েকটি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। তাই সমার্থকদের অগণতান্ত্রিকভাবে ক্ষেপিয়ে দিয়ে তাদের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি সৃষ্টি করে বড় ধরনের সংঘাতের অবস্থাও সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমানে রাজনীতি সম্পূর্ণ ক্ষমতাকেন্দ্রিক। ব্যক্তিকে ব্যক্তির বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়।’ কেউ কাউকে ছাড় দিতে চায় না, মুখে মুখে গণতান্ত্রিক, তবে আচরণে তার বিপরীত বলে মনে করেন ড. তৌহিদুল হক।
 

Link copied!