ডিসেম্বর ১৩, ২০২৩, ০৯:৫৯ এএম
সরকার আদালতকে ব্যবহার করছে : অভিযোগ বিএনপির
- ৯৯৮ নেতাকর্মীর সাজা
- গ্রেপ্তার ২৪ হাজার ১৩১ জন
- মামলা এক হাজার একটি
- আসামি ৮৯ হাজার ৩৬৩ জন
দু-চারজন পুলিশের সাক্ষী ও বাদীতে এমন সাজা খুবই বিস্ময়কর
—কায়সার কামাল, আইনবিষয়ক সম্পাদক, বিএনপি
ভোটের মাঠে লড়াইয়ের সম্ভাব্য নেতাদের সাজা হচ্ছে বেশি
—নজরুল ইসলাম খান, স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিএনপি
ঘুরছে ঘড়ির কাঁটা। আগামী ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন। বাকি আর মাত্র ২৫ দিন। এ পরিস্থিতিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে টানা ৪৫ দিন ধরে ঝুলছে তালা। দলীয় সরকারের অধীনে যায়নি ভোটে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবিতে ভোটে না যাওয়া অন্তত ৬৪টি রাজনৈতিক দলের চলছে আন্দোলন। অব্যাহত রয়েছে হরতাল-অবরোধ। দলটির দপ্তর সূত্র বলছে, গত তিন মাসে বিএনপির প্রায় এক হাজার নেতাকর্মীকে সরকার সাজা দিয়েছে। যাদের অধিকাংশই ছিলেন ভোটের মাঠের প্রার্থী। নির্বাচনে অযোগ্য করতেই সরকার আদালতকে ব্যবহার করে নেতাকর্মীদের সাজা দিচ্ছে বলে অভিযোগ দলটির। এ পর্যন্ত ৬১টি মামলায় ৯ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ ও ৯৯৮ জনের অধিক নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডাদেশ দেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া গত ২৮ ও ২৯ জুলাই থেকে বিএনপির কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ২৪ হাজার ১৩১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। মামলা হয়েছে এক হাজার একটি। আসামি ৮৯ হাজার ৩৬৩ জন। আহত আট হাজার ৯৬৪ জন। মৃত্যু ২১ জনের।
বিএনপি নেতাকর্মীরা বলছেন, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের রাজনৈতিক মালাগুলোকে নির্বাচন-পূর্ব হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছে সরকার। পুলিশের ওপর হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ, নাশকতার অভিযোগেই এসব মামলা হয়েছে। এর মধ্যে অনেক মৃত মানুষ, প্রভাবশালীও রয়েছেন বলে দাবি দলটির। এর মধ্যে সাড়ে ছয় শতাধিক নেতাকর্মীর দুই বছর, অনেকের তিন বছরেরও বেশি সাজা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক মামলায় বিএনপি নেতাকর্মীদের বেশির ভাগ সাজা পুলিশ সদস্যদের জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে হয়েছে। তা ছাড়া এসব মামলার দ্রুত বিচারকাজ সম্পন্ন হওয়ায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে কি-না তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। এসব রায় আগামীতে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে বলেও অনেকের ধারণা।
দণ্ডিত গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মধ্যে রয়েছেন— বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাজাহান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, তথ্যবিষয়ক সম্পাদক আজিজুল বারী হেলাল, স্বেচ্ছাসেবক-বিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু, সহ-স্বেচ্ছাসেবক-বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, সহপ্রচার সম্পাদক শামীমুর রহমান শামীম, গ্রাম সরকার-বিষয়ক সহসম্পাদক বেলাল আহমেদ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব রফিকুল ইসলাম মজনু, নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ রবিউল আলম রবি, হাবিবুর রশিদ হাবিব, আকরামুল হাসান, যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, যুবদলের সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, সাবেক সহসভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান, যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি মামুন হাসান, যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার, ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতা এম কফিল উদ্দিন আহম্মেদ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক খন্দকার এনামুল হক, সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়ন, রংপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আনিসুর রহমান লাকু ও মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন নবী ডন, রাজশাহী জেলা বিএনপি সভাপতি আবু সাঈদ চাঁদ প্রমুখ। এ ছাড়া ওয়ান-ইলেভেনের মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমানের সাজার রায় বহাল রেখেছেন আদালত।
জানতে চাইলে বিএনপির আইন-বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আমার সংবাদকে বলেন, ‘আদালত যেন এখন বিএনপির নেতাকর্মীদের সাজা দেয়ার জন্যই ব্যবহূত হচ্ছে।’ দ্রুত বিচারের প্রতিযোগিতা চলছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। কায়সার বলেন, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ইতিহাসে আইনাঙ্গনে এ রকম ঘটনা কখনোই দেখা যায়নি। এখন নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন দৃশ্যপট দেখা যাচ্ছে। মামলায় চার্জশিটে যাদের সাক্ষী করা হয়েছে, তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ ছাড়াও মামলার রায় দেয়া হয়েছে। এখন যেটি হচ্ছে— শুধু দু’-চারজন পুলিশ সাক্ষী ও পুলিশ বাদীর সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রতিদিনই কোনো না কোনো মামলার রায় হচ্ছে। পুলিশের সাক্ষীতেই একজন মানুষ দণ্ডিত হচ্ছে, এটি খুবই বিস্ময়কর।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘গতকাল পর্যন্ত তাদের ৯৯৮ জনকে সাজা দেয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপিকে নেতৃত্বশূন্য করতেই সরকারের নির্দেশনায় মিথ্যা মামলায় ফরমায়েশি রায় দিচ্ছে আদালত। এসব রায়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, বিএনপি নেতাকর্মীদের দুই বছরের বেশি সাজা দেয়া হচ্ছে; যাতে করে তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অযোগ্য হন।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান আমার সংবাদকে বলেন, ‘সরকার আদালতকে ব্যবহার করে কী উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে, তা এখন দেশের সব মানুষই বুঝে। রাজপথে সরকার পতনে যারা ভূমিকা রাখছেন বা রাখতে পারেন, কিংবা যারা ভোটের মাঠে লড়াই করবেন বেছে বেছে শুধু তাদের সাজা দেয়া হচ্ছে। বিএনপি যে আদালতের মাধ্যামে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, এটি সারা দুনিয়াসহ ১৮ কোটি মানুষের কাছে স্পষ্ট।’
