মো. মাসুম বিল্লাহ
ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৪, ১১:৩৯ এএম
বাংলাদেশে কোকেনের ব্যবহার অত্যন্ত কম বাংলাদেশি মাদক মাফিয়াদের কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি-না তদন্ত করে দেখা হচ্ছে
—মুস্তাকিম বিল্লাহ ফারুকী, মহাপরিচালক, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর
সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে সর্বনাশা মাদক। বাড়ছে মাদকসেবীর সংখ্যা। লাগামহীন বিস্তারে শুধু শহর নয়, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলেও হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় মাদক। প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করে মাদকসেবী ও বহনকারীকে আটক করতে সক্ষম হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকছে মূল হোতারা। সমপ্রতি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধরা পড়া শত কোটি টাকা মূল্যমানের প্রায় সাড়ে আট কেজি কোকেনের গন্তব্য ছিল পার্শ্ববর্তী দেশে ভারত। গ্রেপ্তার সাতজনের কাছ থেকে এ ধরনের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বাংলাদেশে কারা তাদের আশ্রয়দাতা এবং কাদের ইন্ধন ও সহযোগিতায় এ ধরনের মাদকের চালান আনা হয়েছে সে বিষয়টি এখনো সামনে আসেনি। গত ১১ বছরে অন্তত ১০টি চালানসহ বাহক গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা গ্রেপ্তার হচ্ছে না।
জানা গেছে, গত ২৪ জানুয়ারি রাতে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ধরা পড়া শত কোটি টাকা মূল্যমানের প্রায় সাড়ে আট কেজি কোকেন পাচারের জন্য বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এর আগে গত ২২ জানুয়ারি, যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ থেকে ৪২ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) মেট্রো উত্তর। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয় চার চাকমাসহ ৯ মাদক কারবারিকে। সমপ্রতি যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে ২৮ জানুয়ারি ট্রাভেল ব্যাগে ১৪৭ বোতল ফেন্সিডিলসহ দুই মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব-১০। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থানা সূত্রে জানা গেছে, জব্দ হওয়া মাদকের বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক জিল্লুর রহমান বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলায় আসামি করা হয় মাদক বহনকারী মালাউয়ের নারী নোমথানডাজো তোয়েরা সোকোকে। মামলাটির তদন্ত করছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক ওবায়দুর রহমান। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক জিল্লুর রহমান পুরো বিষয়টি মনিটরিং করছেন।
এদিকে গত ২৪ জানুয়ারি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থানাধীন উত্তরা ১ নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর সড়কের ৪ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত হোটেল এনফোর্ড ইন থেকে ২০০ গ্রাম কোকেনসহ মোহাম্মেদি আলি নামে তাঞ্জানিয়ার এক নাগরিককে গ্রেপ্তার করে মাদকদ্র্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এ ব্যাপারে বিমানবন্দর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. হোসেন মিঞা বাদী হয়ে একটি মামলা করেন।
তদন্তকারী সংস্থা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, সফলভাবে বিমানযোগে বাংলাদেশে আসেন তাঞ্জানিয়ার ওই নাগরিক। এরপর তিনি হোটেলে উঠেন কোনো ধরনের বাধা-বিপত্তি ছাড়াই। প্রথমে ছোট চালানটি পরীক্ষামূলকভাবে পাঠানো হতে পারে। সেই চালানটি সফলভাবে পৌঁছার পরই হয়তো দ্বিতীয় চালানটি বিমানবন্দর থেকে খালাস করা হয়। দুটি ঘটনার মধ্যে বিশেষ কোনো যোগসূত্রে আছে কি-না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এর সঙ্গে বিমানবন্দরের কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্টদের কেউ জড়িত কি-না সে বিষয়ে গভীর তদন্ত করছেন গোয়েন্দারা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এর আগেও বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি কোকেনের চালান ধরা পড়েছে। জব্দ হওয়া ওইসব কোকেন এসেছিল ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জন্য। বাংলাদেশকে শুধু মাদক পাচারের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা হয়েছিল। যা পরবর্তীতে তদন্তে বেরিয়ে আসে। এ ছাড়া বাংলাদেশের কোনো মাদক মাফিয়া এর সঙ্গে জড়িত কি-না সেটিও জানতে সম্মিলিতভাবে অনুসন্ধান অব্যাহত আছে। গ্রেপ্তার নারী মালাউইতে নার্স পেশায় জড়িত। এর আগেও তিনি ব্যবসায়িক পারপাসে বাংলাদেশ ভ্রমণ করেছেন।
জানা গেছে, গত বছরের ১০ জুন ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় দুই কেজি কোকেনসহ গ্রেপ্তার হয় মরক্কো থেকে আসা ভারতীয় নারী সালোমি লালরামধারি। জব্দ কোকেনের গন্তব্য ছিল ভারতের নয়াদিল্লি। ২০১৩ সালের ১১ জুন ঢাকার কারওয়ান বাজারের হোটেল লা ভিঞ্চি থেকে প্রায় তিন কেজি কোকেনসহ গ্রেপ্তার হয় পেরুর নাগরিক হুয়ান পাবলো রাফায়েল জাগাজিটা। মামলার আসামি এখনো কারাগারে। মামলাটি নিষ্পত্তি হয়নি। ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রায় আড়াই কেজি কোকেনসহ গ্রেপ্তার হন পেরুর আরেক নাগরিক জেইম বার্গলে গোমেজ। এ মামলায় তার যাবজ্জীবন সাজা হয়। ২০১৫ সালের জুনে চট্টগ্রাম বন্দরে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়া থেকে আসা সূর্যমুখী তেলের ড্রামে ভরা তরল কোকেন ধরা পড়ে। জাহাজে একটি কনটেইনারে আসা ১০৭টি তেলের ড্রামের মধ্যে একটিতে কোকেন পাওয়া যায়। ড্রামটিতে প্রায় ১৮৫ কেজি সানফ্লাওয়ার তেলের পরিবর্তে ছিল তরল কোকেন।
গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর ২৭০ কেজি হেরোইন ও পাঁচ কেজি ৩০০ গ্রাম কোকেনসহ বাংলাদেশি নাগরিক দেওয়ান রাফিউল ইসলাম হিরো ও জামাল উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে শ্রীলঙ্কান পুলিশ।
এ ছাড়া ডিবি পুলিশ গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেল থেকে বাত সোয়ানা নামে এক আফ্রিকান নারীকে প্রায় পাঁচ কেজি কোকেনসহ গ্রেপ্তার করে। তিনি খেয়ে পেটের ভেতরে কোকেনগুলো নিয়ে এসেছিলেন। পরবর্তীতে তার পেটা ব্যথা শুরু হলে হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। হোটেল কর্তৃপক্ষ ডিবি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে জীবন বাঁচাতে ওই আফ্রিকান নারী জানান তার পেটে কোকেন রয়েছে। যা তিনি খেয়ে এনেছেন। নির্ধারিত সময়ে একজন ব্যক্তির বিশেষ ট্যাবলেট নিয়ে তার কাছে আসার কথা ছিল। কিন্তু তিনি আসেননি। পরবর্তীতে ডিবি পুলিশ তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে পেট ওয়াশ করে কোকেনগুলো বের করে। এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় তাকে। এসব ঘটনায় বাহক ধরা পড়লেও এর পেছনের কারিগররা আড়ালেই থেকে গেছেন।
এমন পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে যত মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়, এর চেয়ে অনেক বেশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সেবনকারীদের হাতে পৌঁছে যায়। দেশে মাদকদ্রব্য আসা রোধে আকাশ ও নৌপথ এবং স্থল সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। যদিও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্যমতে, কাটআউট পদ্ধতিতে মাদকের এই বড় চালানটি পাচার করা হচ্ছিল। এর আগেও এ ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। এখানে হাত বদল হওয়ার আগ পর্যন্ত কেউ কাউকে চেনে না। দেশের বাইরে বসে এসব হাত বদলের প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বাহক নির্দেশ মতো হাতবদল করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে সাংকেতিক কোড অথবা ড্রেস কোড ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মুস্তাকিম বিল্লাহ ফারুকী বলেন, যাত্রাবাহী ফ্লাইটগুলোতে যাত্রীদের মালপত্রের মধ্যে মাদক পাচার করে আসছিল একটি চক্র। এ চক্রের হোতা ডন ফ্রাঙ্কির মূল নাম জ্যাকব ফ্রাঙ্কি। তিনি বিগ বস হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে নাইজেরিয়ান কমিউনিটির প্রেসিডেন্টও তিনি। গত ৯ বছর ধরে বাংলাদেশে থাকলেও ৯ মাস আগেই দেশ ছেড়েছেন। এখন নাইজেরিয়ায় বসেই বিভিন্ন দেশের মাদক বহনকারীদের সমন্বয় করছেন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে কোকেনের ব্যবহার অত্যন্ত কম। কোকেনের এত বড় চালানের সঙ্গে বাংলাদেশি মাদক মাফিয়াদের কোনো সম্পৃক্ততা আছে কি-না তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কারণ সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। এ জন্যই জব্দ হওয়া কোকেন নিয়ে রীতিমতো শোরগোল চলছে। বিদেশি মাদক মাফিয়াদের সঙ্গে বাংলাদেশি মাদক মাফিয়াদের জব্দ হওয়া কোকেনের বিষয়ে কোনো যোগসূত্র বা যোগাযোগ আছে কি-না তা নিশ্চিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি।