ইয়ামিনুল হাসান আলিফ
জানুয়ারি ৪, ২০২৬, ০৩:৩৫ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে মোট ২ হাজার ৫৮২টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। মনোনয়ন দাখিলপর্ব শেষে এখন নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে চলছে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কার্যক্রম। এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে আলোচিত ও হেভিওয়েট একাধিক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা ও উত্তাপ।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, মনোনয়নপত্র যাচাইয়ের সময় প্রার্থীদের হলফনামায় তথ্য গোপন, ঋণখেলাপি হওয়া, আয়কর সংক্রান্ত জটিলতার নানা অনিয়ম ধরা পড়ছে। এসব কারণেই বেশ কয়েকজন পরিচিত মুখের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
বাতিল হওয়া প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপি জোট, কমিউনিস্ট পার্টি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের একাধিক প্রভাবশালী নেতা। বিশেষ করে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানো অনেকের মনোনয়নপত্র যাচাইয়ে টেকেনি। এতে করে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর ভেতরে অস্বস্তি ও টানাপোড়েন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ইসি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, দলভিত্তিকভাবে এবারের নির্বাচনে সর্বাধিক প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি মোট ৩৩১ জন। এর পরের অবস্থানে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী (২৭৬ জন), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (২৬৮ জন), জাতীয় পার্টি (২২৪ জন) এবং গণঅধিকার পরিষদ (১০৪ জন)।
বিপুলসংখ্যক মনোনয়নপত্র জমা পড়ার কারণে যাচাই-বাছাই পর্যায়ে নানা ধরনের ত্রুটি ও অসংগতির ঘটনাও তুলনামূলকভাবে বেশি ধরা পড়ছে।
নির্বাচন কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “আইন ও বিধি অনুযায়ী সবার মনোনয়নপত্র সমানভাবে যাচাই করা হচ্ছে। এখানে পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থান বিবেচ্য নয়। যাদের কাগজপত্রে ত্রুটি পাওয়া যাচ্ছে, তাদের মনোনয়ন বাতিল করা হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, যাচাই-বাছাই শেষে একটি প্রাথমিক চিত্র স্পষ্ট হবে, এরপর আপিলের সুযোগ থাকছে।
মনোনয়নপত্র বাতিলের খবরে অনেক প্রার্থীই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কেউ কেউ নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে ‘অপ্রত্যাশিত’ বলে মন্তব্য করেছেন, আবার কেউ কেউ আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা আপিল বোর্ডে আবেদন করে তাদের মনোনয়ন ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন।
বগুড়া-২ আসনের নাগরিক ঐক্যের সভাপতি ও বিএনপি জোট প্রার্থী মাহমুদুর রহমান মান্না, কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, গাইবান্ধা-১ আসনে জামায়াত প্রার্থী মো. মাজেদুর রহমান, বিএনপির মনোনীত প্রার্থী টিএস আইয়ূব, কুড়িগ্রাম-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাহবুব আলম সালেহীসহ বেশ কয়েকজনের মনোনয়ন বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া জাতীয় পার্টির বেশ কয়েকজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র বাছাইপর্ব পার করতে পারেননি।
কুমিল্লা-৫ আসনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফীর মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়েছে।
এছাড়া সাবেক বেশ কিছু সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান, মেয়রদের দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী বা স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়ন পত্র জমা দিলেও বাতিল হয়েছে। আওয়ামী লীগের দুর্গ খ্যাত গোপালগঞ্জে স্বতন্ত্র বা দলীয় ব্যানারে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন একাধিক সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান-মেয়র।
আলোচনায়ও ছিলেন তারা। বাতিল হয়েছে তাদের মনোনয়নপত্র। তালিকায় আছে বিদ্রোহী প্রার্থীও। গোপালগঞ্জ-১ আসনে ১৩ প্রার্থীর মধ্যে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী কাবির মিয়া, স্বতন্ত্র প্রার্থী আশ্রাফুল আলম, নাজমুল আলম ও কাইউম আলী খানের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান।
এছাড়া, গোপালগঞ্জ-২ আসনে ১৩ জন প্রার্থীর মধ্যে ৬ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা।
মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া প্রার্থীরা হলেন- বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, স্বতন্ত্র প্রার্থী কামরুজ্জামান ভূইয়া, শিপন ভূইয়া, রনি মোল্লা, উৎপল বিশ্বাস, মশিউর রহমান।
ভোটারের এক শতাংশ ও ঋণ খেলাপীর কারণে এসব প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। যাচাই-বাছাইয়ের শুরুতেই আলোচনায় আসে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মনোনয়নপত্র বাতিলের ঘটনা। রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, হলফনামা ও দাখিল করা কাগজপত্রে অসংগতির কারণে তার মনোনয়ন বাতিল ঘোষণা করা হয়। এই আসনেই মোট চার প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
কক্সবাজার-২ মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনে মনোনয়নপত্র দাখিলকারী ৭ প্রার্থীর মধ্যে ২ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম মওলা। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফী রতনের মনোনয়ন বাতিল করেছেন কুমিল্লা জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তা। তিনি কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া) আসন থেকে দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ এবং দাখিল করেছিলেন। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ে গাইবান্ধা-০১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে জামায়াতের ইসলামীর হেভিওয়েট প্রার্থী মো. মাজেদুর রহমানসহ আট জনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনে আয়কর রিটার্ন ও সম্পদ বিবরণী না দেয়ায় বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক এমপি শাহ্ শহীদ সারোয়ারের মনোনয়ন বাতিল করা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হেভিওয়েট প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল হওয়া নির্বাচনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। এতে কিছু আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধরন বদলে যেতে পারে, আবার কোথাও কোথাও নতুন মুখের উত্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় বড় দলগুলোর অবস্থানও আরও কঠোর হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
উল্লেখ্য, যাচাই-বাছাই শেষে মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল করার জন্য নির্ধারিত সময় রয়েছে। আপিল নিষ্পত্তির পর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। এরপর প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে শুরু হবে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা। সব মিলিয়ে মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের এই পর্বই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাথমিক উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।