বিশেষ প্রতিবেদক
জানুয়ারি ৬, ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম
বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিহাসে ২০২৫ সাল এক অবিস্মরণীয় এবং মাইলফলক সৃষ্টিকারী বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা ডলারের তীব্র আকাল, আমদানিতে স্থবিরতা আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের আশঙ্কাজনক টানাপোড়েন কাটিয়ে দেশ এখন এক শক্তিশালী ও স্থিতিশীল অবস্থানে দাঁড়িয়েছে।
আর এই অভাবনীয় পরিবর্তনের নেপথ্যে মূল কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন আমাদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বা প্রবাসীরা। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫ সালে প্রবাসীদের পাঠানো আয়ের জোয়ারে শুধু ডলার সংকটই দূর হয়নি, বরং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার এখন অনেক বেশি সমৃদ্ধ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিদায়ী ২০২৫ বছরে প্রবাসীরা বৈধ পথে মোট ৩ হাজার ২৮২ কোটি মার্কিন ডলার পাঠিয়েছেন। এই বিশাল অংকের প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শুধু প্রাণের সঞ্চারই করেনি, বরং বিশ্ববাজারে দেশের আর্থিক সক্ষমতাকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
গত বছরের শুরুতে যেখানে রিজার্ভ নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল তুঙ্গে, সেখানে বছরের ব্যবধানে চিত্রটি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে, যা আমদানিকারক ও বিনিয়োগকারীদের মনে নতুন করে আস্থার জন্ম দিয়েছে।
দেশের ব্যাংকিং খাতের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় ৩৭ শতাংশই এসেছে মাত্র তিনটি ব্যাংকের মাধ্যমে। বরাবরের মতো শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে বেসরকারি খাতের ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। তবে এই তালিকার সবচেয়ে বড় চমক ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর অভাবনীয় সাফল্য।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ: দেশের সর্ববৃহৎ এই বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসীরা পাঠিয়েছেন ৬২০ কোটি ৪০ লাখ ডলার। আস্থার জায়গা ধরে রেখে তারা বরাবরের মতোই নিজেদের শীর্ষস্থান অটুট রেখেছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি): তালিকায় সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন ঘটিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে বিকেবি। তাদের মাধ্যমে দেশে এসেছে ৩১২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। গ্রামীণ পর্যায়ে ব্যাংকিং সেবার বিস্তার এবং প্রবাসীদের পরিবারের কাছে দ্রুত টাকা পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা এই ব্যাংকটিকে শীর্ষে তুলে এনেছে।
অগ্রণী ব্যাংক: রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকটি ২৭৮ কোটি ২০ লাখ ডলার সংগ্রহ করে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। প্রবাসীদের সেবা দানে তাদের আধুনিকায়ন ও বৈচিত্র্যময় রেমিট্যান্স সেবা এই অর্জনে ভূমিকা রেখেছে।
এছাড়াও শীর্ষ ১০-এ থাকা অন্যান্য ব্যাংকের পারফরম্যান্স ছিল প্রশংসনীয়। তালিকায় চতুর্থ স্থানে রয়েছে জনতা ব্যাংক (২২৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার), পঞ্চম ব্র্যাক ব্যাংক (২১৭ কোটি ১০ লাখ ডলার), এবং ষষ্ঠ ট্রাস্ট ব্যাংক (১৮১ কোটি ৬০ লাখ ডলার)। এরপর যথাক্রমে সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, সিটি ব্যাংক এবং ব্যাংক এশিয়া উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে।
২০২৫ সালের পুরো সময় জুড়েই রেমিট্যান্সের গ্রাফ ছিল ঊর্ধ্বমুখী। তবে পরিসংখ্যান বলছে, বিশেষ করে মার্চ মাস বাংলাদেশের রেমিট্যান্স ইতিহাসে এক ‘স্বর্ণাক্ষরে লেখা’ সময়। ওই মাসে একক মাস হিসেবে সর্বোচ্চ ৩২৯ কোটি ডলার আয় দেশে আসে, যা এযাবৎকালের সর্বকালীন রেকর্ড। বছরের শেষ দিকে এসেও সেই ধারা অব্যাহত ছিল এবং ডিসেম্বর মাসে আবারো প্রবাসী আয় ৩০০ কোটি ডলারের কোটা অতিক্রম করে। এই জোরালো প্রবাহ সরাসরি প্রভাব ফেলেছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত পরিবর্তনের কারণে প্রবাসীরা এখন ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে বেশি উৎসাহিত হচ্ছেন:
হুন্ডি ও অর্থ পাচার প্রতিরোধ: ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে হুন্ডি ও অবৈধ অর্থ পাচারের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নজরদারি হুন্ডি চক্রকে দুর্বল করে দিয়েছে। ফলে প্রবাসীরা ঝুঁকির বদলে বৈধ পথে টাকা পাঠানোকেই নিরাপদ মনে করছেন।
বাজারভিত্তিক ডলার রেট বা 'ক্রলিং পেগ': দীর্ঘদিন ধরে ডলারের বিনিময় হার কৃত্রিমভাবে ধরে রাখার ফলে ব্যাংকের তুলনায় খোলা বাজারে (কার্ব মার্কেট) ডলারের দাম অনেক বেশি ছিল। বর্তমানে বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করায় ব্যাংক এবং খোলা বাজারের ব্যবধান প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এতে প্রবাসীরা ব্যাংকে টাকা পাঠিয়ে ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন।
নগদ প্রণোদনা ও ডিজিটাল সেবা: সরকার ঘোষিত ২.৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনার পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আরও অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান করছে। এছাড়া বিকাশ, নগদ বা রকেটের মতো মোবাইল আর্থিক সেবার (MFS) সাথে ব্যাংকগুলোর সরাসরি এপিআই (API) সংযোগের ফলে বিদেশের রেমিট্যান্স মুহূর্তেই পরিবারের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে।
গত কয়েক বছরে ডলার সংকটের কারণে জ্বালানি তেল, সার এবং শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি (LC) খোলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। ২০২৫ সালে এই বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আসায় দেশের আমদানি বাণিজ্য আবার সচল হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে ডলারের যোগান পর্যাপ্ত থাকায় ব্যবসায়ীদের এলসি খুলতে আগের মতো মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। এর ফলে বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পথ প্রশস্ত হয়েছে।
আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ টেকসই করতে হলে প্রবাসীদের জন্য বিমা সুবিধা ও বিনিয়োগ স্কিম আরও আকর্ষণীয় করতে হবে। তাদের মতে, ২০২৫ সালের এই অর্জন প্রমাণ করে যে, সঠিক নীতি সহায়তা এবং স্বচ্ছতা থাকলে প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে বিপ্লব ঘটিয়ে দিতে পারেন।
২০২৫ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি পুনর্জন্মের বছর। প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ শুধু বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বাড়ায়নি, বরং জাতীয় অর্থনীতিকে খাদের কিনারা থেকে তুলে এনে সম্ভাবনার নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
জেএইচআর