নিজস্ব প্রতিবেদক
মার্চ ৮, ২০২৬, ১২:০৬ এএম
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া সামরিক উত্তেজনা বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা এবং তেহরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় যে সংঘাত শুরু হয়েছে, তা দীর্ঘস্থায়ী হলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেতে পারেন উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত লাখো প্রবাসী বাংলাদেশি।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে, অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্প থমকে যেতে পারে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে শ্রমবাজারে। এর ফলে চাকরি হারানো, আয় কমে যাওয়া বা দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হওয়ার মতো পরিস্থিতির মুখে পড়তে পারেন বহু প্রবাসী শ্রমিক। এমন পরিস্থিতি শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও বড় চাপ তৈরি করতে পারে।
প্রবাসীদের নীরব সংগ্রাম: বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মসংস্থানের আশায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। তাদের অনেকেই পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করতে বা ঋণ শোধের আশায় বিদেশে যান। পরিবারের সদস্যদের ছেড়ে দীর্ঘ সময় বিদেশে কাটানো, অপরিচিত পরিবেশে কাজ করা এবং অনিশ্চিত কর্মপরিস্থিতির মধ্যে জীবনযাপন সব মিলিয়ে তাদের জীবনে রয়েছে এক ধরনের নীরব মানসিক চাপ।
সমাজবিজ্ঞানীরা এই পরিস্থিতিকে ‘সোশ্যাল কস্ট’ বা সামাজিক ক্ষতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। অর্থনৈতিক লাভের হিসাব কাগজে-কলমে ধরা পড়লেও পরিবারের বিচ্ছিন্নতা, মানসিক চাপ কিংবা সামাজিক সম্পর্কের দূরত্বের মতো বিষয়গুলো পরিসংখ্যানের বাইরে থেকে যায়।
বর্তমানে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল(জিসিসি) ভুক্ত ছয়টি দেশে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনে প্রায় ৪৫ লাখ বাংলাদেশি কাজ করছেন। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর আয়ের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবার।
যুদ্ধের প্রভাব শ্রমবাজারে: বিশ্ব রাজনীতির টানাপোড়েন যখন মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতে রূপ নেয়, তখন তার প্রভাব পড়ে সেখানকার অর্থনীতিতে। তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো সাধারণত বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প, নির্মাণ খাত এবং সেবাখাতে বিপুল বিনিয়োগ করে থাকে। এসব খাতেই সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য।
কিন্তু যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘ হলে সরকারগুলো উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ কমিয়ে সামরিক ব্যয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যায়, অনেক প্রকল্প স্থগিত হয় এবং শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি বাড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের প্রবাসী শ্রমিকরা, যারা নির্মাণ, পরিবহন, পরিষেবা কিংবা কারখানায় কাজ করেন। তাদের অনেকেরই স্থায়ী কর্মচুক্তি থাকে না এবং সংকট দেখা দিলে প্রথমেই তাদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা থাকে।
দেশে ফেরার ঝুঁকি: যদি সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় এবং প্রবাসী শ্রমিকরা চাকরি হারান, তাহলে তাদের বড় একটি অংশ দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হতে পারেন। কিন্তু দেশে ফিরে তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, হঠাৎ করে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরে এলে দেশের শ্রমবাজারে চাপ বাড়বে। ইতোমধ্যে বেকারত্বের যে সমস্যা রয়েছে, তার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হবে বিদেশফেরত শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের প্রশ্ন।
এছাড়া বিদেশে যাওয়ার জন্য নেয়া ঋণ শোধ করতে না পারার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। অনেক শ্রমিক দালাল বা রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশে যান। চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরলে সেই ঋণের বোঝা আরও বড় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
রেমিট্যান্সে সম্ভাব্য ধাক্কা: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস হলো এই রেমিট্যান্স।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৫.৪০ শতাংশ এসেছে জিসিসিভুক্ত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। অর্থাৎ এই অঞ্চলের শ্রমবাজারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হলে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে।
রেমিট্যান্স কমে গেলে আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখার মতো বিষয়গুলো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে চাপ: প্রবাসীরা দেশে টাকা পাঠিয়ে শুধু পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করেন না, গ্রামীণ অর্থনীতিকেও সচল রাখেন। অনেক পরিবারই সম্পূর্ণভাবে প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল।
যদি সেই আয় হঠাৎ কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে অনেক পরিবার দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ফলে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ওপর চাপ বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গ্রামীণ অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমে গেলে স্থানীয় ব্যবসা, কৃষি এবং ছোট উদ্যোক্তাদের ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে। এতে সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মন্থরতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহীদুল জাহীদ মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তার মতে, অনেক প্রবাসী শ্রমিক তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। তাদের আয় বন্ধ হয়ে গেলে সন্তানদের পড়াশোনা থেকে শুরু করে পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা পর্যন্ত বিপর্যস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে সামাজিক অস্থিরতাও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির পরিবর্তন এখন অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হয়ে উঠছে। তাই ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় এই বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
করোনার অভিজ্ঞতা: কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক কর্মকা্ল স্থবির হয়ে পড়েছিল। তখনও বহু প্রবাসী শ্রমিক চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন।
সেই অভিজ্ঞতা থেকে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বড় ধরনের বৈশ্বিক সংকট দেখা দিলে শ্রমবাজারে প্রথম ধাক্কা আসে প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর। বিশেষ করে নির্মাণ ও সেবাখাতের মতো অস্থায়ী কর্মসংস্থান নির্ভর খাতগুলোতে দ্রুত সংকট দেখা দেয়।
চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপট: গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যৌথ সামরিক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। ওই হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বহু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নিহত হন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে দাবি করা হয়েছে। এই ঘটনার পরপরই তেহরান বিভিন্ন স্থানে পাল্টা হামলা শুরু করে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি এবং সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
সংঘাতে ইতোমধ্যে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। বিভিন্ন দেশে হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে এবং পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, সংঘাত অন্তত কয়েক সপ্তাহ অব্যাহত থাকতে পারে। তবে এটি আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ: মধ্যপ্রাচ্যের এই উত্তেজনা বাংলাদেশের জন্য একাধিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। প্রথমত, শ্রমবাজার সংকুচিত হলে নতুন করে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, প্রবাসী আয় কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
তৃতীয়ত, বিদেশফেরত শ্রমিকদের পুনর্বাসন এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সরকারের জন্য বড় দায়িত্ব হয়ে উঠতে পারে।
করণীয় কী: বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে এখন থেকেই বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার উদ্যোগ নিতে হবে। ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া কিংবা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের দক্ষতা অনুযায়ী কাজে লাগানোর পরিকল্পনাও নেওয়া প্রয়োজন। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং পুনর্বাসন প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক কর্মকা্লে যুক্ত করা যেতে পারে।
সর্বোপরি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আপাতত দূরের কোনো যুদ্ধের খবর মনে হলেও বাস্তবে এর প্রভাব বাংলাদেশের লাখো পরিবারের জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। তাই সেই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু শ্রমবাজারেই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়তে পারে। এই বাস্তবতায় পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি নেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।