ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

কোটি টাকার ফুটপাত বাণিজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

মার্চ ১৬, ২০২৬, ১২:১৬ এএম

কোটি টাকার ফুটপাত বাণিজ্য

রাজধানীর গুলিস্তান এলাকায় ফুটপাত এখন কোটি টাকার বাণিজ্যের মঞ্চে পরিণত হয়েছে। সরকারি রাস্তা ও ফুটপাত দখল করে চলছে অবৈধ দোকান ও হকারদের ব্যবসা, যেখানে কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়ে যাচ্ছে প্রশাসনের নাকের ডগায়। নীরব কর্তৃপক্ষ এবং অস্পষ্ট নিয়ন্ত্রণের কারণে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে, যা সাধারণ নাগরিক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই  এলাকা বহু বছর ধরে হকারদের দখলে।

ফুটপাত ‘বিক্রি’, কতটা নগদ লাগে : ফুটপাত বা সড়কের জন্য দোকান দখল করতে হলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের কাছে মোটা অংকের টাকা দিতে হয়। স্থানীয় হকাররা জানিয়েছেন, মাত্র ৫ ফিটের একটি দোকানের জন্য মাসে ৮ হাজার টাকা দিতে হয়। তবে এটি মূলত শুধু মাসিক ভাড়া নয়। দোকান স্থাপনের জন্য এককালীন ‘অ্যাডভান্স’ ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। দোকানদারদের মতে, এই পুরো প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ইউনিট নেতারা জড়িত। ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তির নাম পরিবর্তিত হলেও নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি অপরিবর্তিত থাকে। মূলত কয়েকটি গোষ্ঠী পুরো গুলিস্তানকে ভাগাভাগি করে নিয়ন্ত্রণ করছে।

বৈদ্যুতিক সংযোগও অবৈধ : দোকানদারদের অভিযোগ, সন্ধ্যা নামতেই প্রতিটি দোকানেবৈদ্যুতিক সংযোগ চালু হয়। তবে এই সংযোগগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ। প্রতি সংযোগে দোকানদারদের প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০ টাকা দিতে হয়। এটি শুধুমাত্র বিদ্যুতের খরচ নয়; প্রায়শই এটি চাঁদাবাজির একটি আঙ্গিক হিসেবে চলে। হকারদের কথায়, ‘যে দোকানটিতে পাঁচ ফিট জায়গা করতে চাই, তার জন্য ৫০ হাজার বা এক লাখ টাকা দিতে হয়। চকি ফেলে বিক্রি করা হয়। সরকার যেই আসে, তার নেতাকর্মীরাই এটি চালায়।’

পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা : ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘পুলিশ হকারদের কাছ থেকে কোনো চাঁদা নেয় না। যদি কারো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ তবে হকাররা দাবি করছে, কখনো কখনো চাঁদাবাজ চক্র পুলিশ বা প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে এই কর্মকাণ্ড চালাতে পারে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘গুলিস্তানসহ সব ফুটপাত থেকে হকারদের সরানোর জন্য পরিকল্পনা রয়েছে। অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। যারা ব্যবসা করছেন, সেটা আমরা বিদ্যুৎ বিভাগের নজরে আনব এবং ব্যবস্থা নেব।’

ফুটপাত দখল ও সামাজিক প্রভাব : এই ফুটপাত দখল শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বিষয় নয়; এটি সামাজিক ও নিরাপত্তার উপরও প্রভাব ফেলে। প্রচুর হকার এই এলাকায় ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দোকান বসিয়ে চলাচলের পথ বন্ধ করে দিয়েছে। সাধারণ পথচারীরা বাধার সম্মুখীন হন। এছাড়া অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগের কারণে ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছে।

দোকানদারদের কথায়, এই এলাকায় ব্যবসা করার জন্য চাপ প্রায়শই শারীরিক হুমকি বা সংঘর্ষের মাধ্যমে বজায় থাকে। এই অবস্থায় অনেক হকারের মুখ খুলতে সাহস নেই। সামাজিক ও প্রশাসনিক নীরবতার কারণে অবৈধ নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ : গণনা অনুযায়ী, প্রায় দুই কিলোমিটার সড়কজুড়ে দুই হাজারের বেশি দোকান রয়েছে। মাসিক ভাড়া ৬ থেকে ১০ হাজার টাকা, দোকান প্রতি অ্যাডভান্স ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। এর অর্থ বছরে কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়। হকাররা এই অর্থের একটি অংশ প্রশাসনের নাকের ডগায়, কখনো কখনো পুলিশ বা সিটি করপোরেশন কর্মকর্তাদের মাঝে বণ্টিত হয় বলে অভিযোগ আছে।

রাজনৈতিক প্রভাব : গুলিস্তান অঞ্চলের ফুটপাত দখল মূলত রাজনৈতিক দলের ইউনিট নেতাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি অপরিবর্তিত থাকে। রাজনৈতিক নেতারা প্রায়শই এই চাঁদাবাজি থেকে উপকৃত হন। স্থানীয় হকাররা মনে করেন, ‘যে সরকার আসে, তার নেতা বা প্রতিনিধি এই নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব গ্রহণ করে।’ রাজনৈতিক প্রভাব কেবল চাঁদাবাজিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা এবং এলাকায় অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলে। এইভাবে ফুটপাত দখল দীর্ঘ সময় ধরে একটি অবৈধ অর্থনৈতিক চক্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

প্রশাসনের পরিকল্পনা : ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন জানিয়েছে, ফুটপাত থেকে হকারদের সরানো হলে বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি করার আহ্বান জানানো হবে। এছাড়া অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে, হকারদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা হ্রাস পাবে এবং এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা সহজ হবে।

সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে সতর্কবার্তা প্রদান করা হবে, যাতে কেউ বৈদ্যুতিক সংযোগ অবৈধভাবে ব্যবহার না করে। সঠিক নিয়ম অনুযায়ী ব্যবসা করলে প্রশাসন সহায়তা করবে।

সমস্যা ও সমাধানের দিকনির্দেশনা : হকারদের মাধ্যমে ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি একদিকে যেমন অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেন সৃষ্টি করছে, তেমনি এটি নগর জীবনে অশৃঙ্খলা এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যার সমাধান করতে হলে- ফুটপাত থেকে হকারদের সরানোর কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে হবে, বিকল্প কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামের মাধ্যমে হকারদের জীবিকায় সহায়তা দিতে হবে, অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে কড়া পদক্ষেপ নিতে হবে, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করতে এবং রাজনৈতিক প্রভাব কমাতে মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। এই পদক্ষেপ গ্রহণ করলে শুধুমাত্র চাঁদাবাজি বন্ধ হবে না, বরং শহরের চলাচল নিরাপদ হবে এবং নাগরিকদের জীবনের মান বৃদ্ধি পাবে।

স্থানীয়দের অভিমত : গুলিস্তানের সাধারণ মানুষ ও পথচারীরা অভিযোগ করেছেন, ‘দোকানদাররা দিনে দিনে ফুটপাত দখল করে। পুলিশ ও প্রশাসন থাকলেও আমরা প্রতিনিয়ত বাধার সম্মুখীন হচ্ছি। কিছু করার সাহস নেই।’ হকারদের কথায়, ‘আমাদেরও সংসার চালাতে হবে। প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতারা নিয়ন্ত্রণ চালায়। আমরা বাধ্য হয়ে টাকা দেই।’ এই বাস্তবতা রাজধানীর ফুটপাত দখলের নেপথ্য রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রমাণ।

সর্বোপরি, সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য ও স্থানীয়দের সাক্ষ্য অনুযায়ী, এই ফুটপাতের ব্যবসা কোটি টাকার রমরমা চাঁদাবাজি আর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ার সঙ্গে মিশে আছে। শুধুমাত্র গুলিস্তান হকার মার্কেট থেকে গোলাপশাহ মাজার পর্যন্ত ১০০ মিটার রাস্তার মধ্যে প্রায় ৩০০টি দোকান রয়েছে। পুরো গুলিস্তানজুড়ে এই সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি। গুলিস্তানের ফুটপাত ও সড়ক বিক্রি একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক নীরবতা এবং হকারদের সক্রিয়তা মিলে এটি একটি অবৈধ অর্থনৈতিক চক্রে পরিণত হয়েছে। সিটি কর্পোরেশন ও পুলিশ এই পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কতটা কার্যকর হবে, সেটাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।

Link copied!