রুহেল হাশেমী
মার্চ ৩১, ২০২৬, ১২:০৪ এএম
দেশের ক্রীড়াঙ্গনে পেশাদারিত্ব ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘ক্রীড়া হলে পেশা, পরিবার পাবে ভরসা’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ক্রীড়া কার্ড ও ভাতা প্রদান কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগ দেশের ক্রীড়াবিদদের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রযুক্তিনির্ভর ভাতা প্রদান : অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ল্যাপটপে বাটন চাপার সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্রীড়াবিদদের মোবাইল অ্যাকাউন্টে তাৎক্ষণিকভাবে এক লাখ টাকা করে ভাতা পৌঁছে যায়। এই ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ বিতরণকে স্বচ্ছতা ও দ্রুততার একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
১২৯ ক্রীড়াবিদের হাতে কার্ড ও সম্মাননা : প্রথম ধাপে দেশের ২০টি ডিসিপ্লিনের মোট ১২৯ জন ক্রীড়াবিদের হাতে ক্রীড়া কার্ড তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জনকারী ক্রীড়াবিদদের বিশেষ সম্মাননাও প্রদান করা হয়। এই কার্ডের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ক্রীড়াবিদরা নিয়মিত ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পাবেন বলে জানানো হয়েছে।
ধর্মীয় পাঠের মধ্য দিয়ে সূচনা : অনুষ্ঠানটি শুরু হয় সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে। পরে অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ থেকেও পাঠ করা হয়, যা অনুষ্ঠানের ধর্মীয় সমপ্রীতির দিকটি তুলে ধরে। এরপর স্বাগত বক্তব্য দেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুব-উল-আলম।
ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাস তুলে ধরা ডকুমেন্টারি : অনুষ্ঠানে একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করা হয়, যেখানে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাস ও অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরা হয়। ডকুমেন্টারিতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং ক্রীড়া সংগঠক আরাফাত রহমান কোকোর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।নতুন পরিকল্পনার চিত্র : ভিডিওতে বর্তমান সরকারের ক্রীড়া উন্নয়ন পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- তৃণমূল পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরি, নতুন খেলার মাঠ নির্মাণ, ক্রীড়াবিদদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি।
এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজানো হয় জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক গান ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার, শেষ বাংলাদেশ’ এই সংগীত অনুষ্ঠানে আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে এবং ক্রীড়াবিদদের মধ্যে দেশপ্রেম ও অনুপ্রেরণা জাগিয়ে তোলে।
বেতন কাঠামোর আওতায় ক্রীড়াবিদ : সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী, বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের ক্রীড়াবিদদের ধাপে ধাপে বেতন কাঠামোর আওতায় আনা হবে। তবে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) স্বনির্ভর হওয়ায় ক্রিকেটাররা এই তালিকার বাইরে থাকবেন।
পারফরম্যান্সভিত্তিক মূল্যায়ন : যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক জানান, এই কর্মসূচির আওতায় থাকা ক্রীড়াবিদদের প্রতি চার মাস পর পর পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করা হবে। তিনি বলেন, ‘যারা ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফরম্যান্স বজায় রাখতে পারবেন, তারা এই সুবিধা পাবেন। আর যারা পারফরম্যান্সে পিছিয়ে পড়বেন, তারা তালিকা থেকে বাদ পড়বেন।’
ধাপে ধাপে ৫০০ ক্রীড়াবিদ অন্তর্ভুক্তি : প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, এপ্রিল মাস থেকে পর্যায়ক্রমে মোট ৫০০ জন ক্রীড়াবিদকে এই বেতন কাঠামোর আওতায় আনা হবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে পেশাদারিত্ব আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। এছাড়া মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আহমেদ আযম খান, মিজানুর রহমান মিনু, শামা ওবায়েদ ইসলাম। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, ক্রীড়া সংগঠক এবং ক্রীড়াবিদরা।
ক্রীড়া বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ দেশের ক্রীড়াঙ্গনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ে নতুন প্রতিভা উঠে আসতে সহায়তা করবে। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, সঠিক বাস্তবায়ন এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কর্মসূচির মাধ্যমে ক্রীড়াবিদদের আর্থিক নিরাপত্তা বাড়বে, পেশাদার খেলোয়াড় তৈরির সুযোগ বাড়বে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভালো ফলের সম্ভাবনা তৈরি হবে, নতুন প্রজন্ম খেলাধুলায় আগ্রহী হবে। তবে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যেমন- সঠিকভাবে পারফরম্যান্স মূল্যায়ন, রাজনৈতিক বা অন্য প্রভাবমুক্ত তালিকা তৈরি, দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়ন নিশ্চিত করা।
৩০ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে দেশব্যাপী ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা করেছেন, আগামী ৩০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী নতুন আঙ্গিকে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ শুরু হতে যাচ্ছে।
‘নতুন কুঁড়ি’র ইতিহাস ও পুনরায় প্রবর্তন : স্বাধীন বাংলাদেশে শিশু-কিশোরদের প্রতিভা আবিষ্কারের লক্ষ্য নিয়ে ১৯৭৬ সালে চালু হয়েছিল ‘নতুন কুঁড়ি’। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় এই অনুষ্ঠান একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যায়। তবে সমপ্রতি পুনরায় বিটিভিতে চালু হয়েছে। এবার নতুন সংস্করণে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ দেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যে ক্রীড়ার প্রতিভা খুঁজে বের করার জন্য বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রথম এ প্রোগ্রামটি সিলেট থেকে শুরু হবে এবং পরবর্তীতে তা ধাপে ধাপে সারা দেশে সমপ্রচারিত হবে।
ক্রীড়া ও পেশাগত স্বীকৃতি : তারেক রহমান আরও বলেন, ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করা মানে শুধু খেলার আনন্দ নয়, বরং এটি একটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মাধ্যমও। ‘যিনি যে খেলায় ভালো করতে পারবেন, সেই খেলায় মনোনিবেশ করে পেশা হিসেবে অনুশীলন করতে পারবেন। আমরা চাই, একজন খেলোয়াড় যেন নিজ এবং পরিবারের জন্য অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে না ভোগেন। এজন্য দেশে প্রথমবারের মতো ক্রীড়াবিদদের বেতন কাঠামো ও ক্রীড়া ভাতা প্রদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী ব্যাখ্যা করেছেন, এই উদ্যোগ কেবল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের প্রতিযোগিতা নয়, বরং স্থানীয় ও স্কুল পর্যায়ের খেলোয়াড়দেরও সাপোর্ট দেবে। বেতন কাঠামো অনুযায়ী, খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স নিয়মিত মূল্যায়ন করা হবে এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স বজায় রাখলে তারা ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা অব্যাহতভাবে পাবেন।
নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের কাঠামো : ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর নতুন সংস্করণে বিভিন্ন বয়স ও দক্ষতার স্তরের শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। অনুষ্ঠানে শুধু শারীরিক ক্রীড়া নয়, মনস্তাত্ত্বিক ও দলগত খেলার মান যাচাই করা হবে। এতে অংশগ্রহণকারীরা একক, দলগত ও বহুধারী প্রতিযোগিতার মাধ্যমে তাদের দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারবে। বৃহৎ স্কেল বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের গভীরতম পর্যায় থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা উঠে আসবে। স্কুল, কলেজ ও স্থানীয় ক্লাব পর্যায়ের প্রতিভা সনাক্ত করার জন্য একটি বিশেষ মনিটরিং সেল কাজ করবে।
সর্বোপরি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্বোধন করা ক্রীড়া কার্ড ও ভাতা কর্মসূচি দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ক্রীড়াবিদদের জীবনমান উন্নয়ন, পেশাদারিত্ব বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।