ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

রোগ নিয়ন্ত্রণে বাড়ছে চ্যালেঞ্জ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

এপ্রিল ২২, ২০২৬, ১২:৪২ এএম

রোগ নিয়ন্ত্রণে বাড়ছে চ্যালেঞ্জ

একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য আজ এক জটিল ও বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি। একদিকে যেমন পুরোনো সংক্রামক রোগগুলো নতুন শক্তিতে ফিরে আসছে, অন্যদিকে অসংক্রামক ও জীবনযাত্রানির্ভর রোগের বিস্তার জনস্বাস্থ্যের ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা রোগজীবাণুর বংশবিস্তার ও বিস্তৃতিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া কিংবা হামের মতো রোগের প্রাদুর্ভাব জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে বারবার আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

বর্তমানে রোগ নিয়ন্ত্রণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ডাটা ব্লাইন্ডনেস’ বা তথ্যের অভাব এবং যথাযথ নজরদারি ব্যবস্থার স্থবিরতা। অনেক ক্ষেত্রে রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটার পর ব্যবস্থা নেয়ার যে ‘প্রতিক্রিয়ামূলক’ সংস্কৃতি, তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে বাধা সৃষ্টি করছে। এছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা ওষুধের কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়া আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য এক নীরব টাইম-বোমা হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। এই পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটে কেবল চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব না দিয়ে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, আগাম সতর্কবার্তা এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, জনস্বাস্থ্যের এই নীরব বিপর্যয় ভবিষ্যতে এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে খুব দ্রুতই ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, জিকা, ম্যালেরিয়া এবং কালাজ্বরসহ অন্তত ২৬টি সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ একসঙ্গে দেশে ‘নীরব জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়’ ডেকে আনতে পারে।

টিকাদানে ঘাটতি- অরক্ষিত শৈশব, বাড়ছে মৃত্যু : সমপ্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ব্যাহত হওয়ায় শিশুদের মধ্যে হাম ও রুবেলার সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত এক মাসে (১৫ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিল) হামে আক্রান্ত হয়ে ৩৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে প্রায় সাড়ে ২১ হাজার শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। যক্ষ্মা, পোলিও, নিউমোনিয়া ও হেপাটাইটিস-বি প্রতিরোধক টিকা সংগ্রহে প্রশাসনিক বিলম্ব এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে আগামী কয়েক বছরে ডিপথেরিয়া ও পোলিওর মতো নির্মূল হয়ে যাওয়া রোগগুলো ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এক বাহক, একাধিক রোগ ‘হট অ্যান্ড হিউমিড’ আবহাওয়ার ফাঁদ : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের আবহাওয়া এখন মশার বংশবিস্তারের জন্য ‘আদর্শ’ হয়ে উঠেছে। এডিস, অ্যানোফিলিস এবং কিউলেক্স মশা এখন একই ভৌগোলিক এলাকায় সহাবস্থান করছে। ফলে একই অঞ্চলে একই সময়ে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া এবং ফাইলেরিয়া ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ছে।

কেন বাড়ছে ঝুঁকি : অনুকূল আবহাওয়া: এপ্রিল মাস থেকে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মশার জীবনচক্র দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে। থেমে থেমে বৃষ্টিপাত পাত্রে পানি জমিয়ে মশার প্রজনন ত্বরান্বিত করছে। নগরের ‘নার্সারি’: নির্মাণাধীন ভবন, এসি ট্রে, টবের পানি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব শহরগুলোকে মশার কারখানায় পরিণত করেছে। ডাটা ব্লাইন্ডনেস: মাঠপর্যায়ে প্রকৃত সংক্রমণের তথ্য না থাকায় স্বাস্থ্য বিভাগ কেবল ‘রিঅ্যাক্টিভ’ বা রোগ হওয়ার পর ব্যবস্থা নিচ্ছে। আগাম সতর্কবার্তা বা ‘লার্ভা সার্ভে’ কার্যক্রম এখন অনেকটাই স্থবির।

ওপি স্থবিরতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা : স্বাস্থ্য খাতের ‘অপারেশনাল প্ল্যান’ (ওপি) কার্যক্রমের স্থবিরতা বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ। ওপি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লার্ভা সার্ভেয়িং, মশারি বিতরণ এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ কর্মসূচিগুলো সীমিত হয়ে গেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘ভেক্টর বাহিত রোগ কেবল স্বাস্থ্য খাতের সমস্যা নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। সিটি কর্পোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই ঝুঁকি মোকাবিলা অসম্ভব।’

নজরদারির ভাঙন- দৃশ্যমান হচ্ছে অদৃশ্য সংকট : বর্তমানে নজরদারি ব্যবস্থা কেবল হাসপাতালকেন্দ্রিক তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু কমিউনিটি পর্যায়ের সংক্রমণ বা উপসর্গহীন বাহকরা হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা একে ‘ডাটা ব্লাইন্ডনেস’ বলে অভিহিত করছেন। আইইডিসিআর-এর সাবেক কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, একটি সংক্রমণ সময়মতো শনাক্ত না হলে তা দ্রুত ‘ক্লাস্টার’ বা বড় প্রাদুর্ভাবের রূপ নিতে পারে। বিশেষজ্ঞের সতর্কতা: ‘প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি স্থগিত করার আগে বিকল্প কৌশল নির্ধারণ না করায় মাঠপর্যায়ে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এর খেসারত দিতে হবে দীর্ঘমেয়াদে।’

উত্তরণের পথ, প্রয়োজন ‘হোল-অব-গভর্নমেন্ট’ পদ্ধতি : বর্তমান নাজুক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিশেষজ্ঞরা কিছু জরুরি পদক্ষেপের কথা বলেছেন— ১.সমন্বিত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা: মশার ঘনত্ব ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে আগাম ব্যবস্থা নেয়া। ২. ক্র্যাশ প্রোগ্রাম: বর্ষার আগেই প্রতিটি ওয়ার্ডে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। ৩. টিকা সরবরাহ নিশ্চিত: দ্রুততম সময়ে ঘাটতি থাকা টিকা সংগ্রহ ও ইপিআই কার্যক্রম জোরদার করা। ৪. জনসচেতনতা: স্কুল, অফিস ও বাড়ি পরিষ্কার রাখতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা ইতোমধ্যেই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড চিহ্নিত করে বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু করেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখাও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ এখন এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে। প্রস্তুতিহীন এই জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল সংস্কার না হলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে দেশ এক নজিরবিহীন স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে। রোগ নিয়ন্ত্রণ কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একক কোনো দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি সমন্বিত জাতীয় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ক্রমবর্ধমান জনঘনত্ব এবং অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের মতো বৈশ্বিক সমস্যাগুলো আমাদের প্রচলিত স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোকে প্রতিনিয়ত প্রশ্নবিদ্ধ করছে। অতীতের সাফল্য নিয়ে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই; কারণ একটি সংক্রামক রোগের সামান্য অবহেলাও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলায় আমাদের অবশ্যই ‘প্রতিক্রিয়ামূলক’ ব্যবস্থা থেকে সরে এসে ‘প্রতিরোধমূলক’ কৌশলে মনোনিবেশ করতে হবে। এজন্য আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, শক্তিশালী ডাটা ম্যানেজমেন্ট এবং তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত টিকাদান ও সচেতনতা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করা অপরিহার্য। একই সাথে নগর পরিকল্পনা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে নিবিড় সমন্বয় প্রয়োজন। একটি সুস্থ ও সবল জাতি গঠনে রোগ নিয়ন্ত্রণের প্রতিটি চ্যালেঞ্জকে বিজ্ঞানসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে মোকাবিলা করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। নতুবা, জনস্বাস্থ্যের এই অদৃশ্য ফাটলগুলো একদিন উন্নয়ন ও অগ্রগতির সকল অর্জনকে গ্রাস করে নিতে পারে।

Link copied!