ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

মধ্যবিত্তের নতুন চ্যালেঞ্জ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ১২:১২ এএম

মধ্যবিত্তের নতুন চ্যালেঞ্জ

২০২৬ সালের এই দহনবেলায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি এক অদ্ভুত ও নির্মম সমীকরণের মুখোমুখি। যে মধ্যবিত্ত একসময় ছিল স্থিতিশীল অর্থনীতির মেরুদণ্ড, আজ তারা নিজের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ক্লান্ত। বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং ডলার সংকটের চাবুক তাদের চিরায়ত ‘সঞ্চয়ী’ পরিচয়কে বদলে ‘সংগ্রামী’ করে তুলেছে। এখনকার বাস্তবতা আর ডাল-ভাতের সাধারণ সুখের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিটি পদক্ষেপে হিসাব মেলানোর এক অন্তহীন যুদ্ধ।

আয় যেখানে স্থবির, সেখানে ব্যয় বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। মধ্যবিত্তের ডাইনিং টেবিল থেকে কাটছাঁট শুরু হয়ে তা এখন সন্তানদের শিক্ষা আর অসুস্থ বাবা-মায়ের চিকিৎসার বাজেটে গিয়ে ঠেকেছে। লোকলজ্জার ভয়ে তারা না পারছে টিসিবির লাইনে দাঁড়াতে, না পারছে কারো কাছে হাত পাততে। এই নীরব হাহাকারের নামই এখনকার মধ্যবিত্ত। একদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বড় প্রকল্পের স্বপ্ন, অন্যদিকে প্রতিদিনের কাঁচাবাজারের রুক্ষ বাস্তবতা- এই দুইয়ের মাঝে পিষ্ট হওয়া মানুষগুলো এখন কেবল টিকে থাকার নতুন নতুন কৌশল শিখছে। এই নতুন বাস্তবতায় বিলাসিতা এখন অতীত, আর ‘কোনোমতে বেঁচে থাকা’ই হয়ে উঠেছে পরম প্রাপ্তি। তাদের নীরব লড়াইয়ের গল্পগুলো আধুনিক অর্থনীতির এক অদৃশ্য কালো অধ্যায়।

বাজারে উত্তাপ : রাজধানীর এক কোণের একটি ছোট হোটেল।  আগে যে পরোটা পাঁচ টাকায় পাওয়া যেত, তার দাম এখন দশ টাকা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, দাম বাড়লেও পরোটার আকার চারপাশ থেকে সংকুচিত হয়ে আসছে। এটি কেবল একটি পরোটার গল্প নয়, এটি বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি রূপক চিত্র।

গ্যাস সংকটের কারণে মাটির চুলায় রান্না করতে বাধ্য হওয়া গৃহিণীরা বলছেন, এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এখন নাগালের বাইরে। ভোজ্য তেলের দামের ওঠানামায় মধ্যবিত্তের হেঁশেল এখন অনেকটাই নিরানন্দ। মাছের বাজারে ইলিশ বা রুই এখন অনেকের জন্য বিলাসিতা। মাছের আস্ত শরীরের বদলে এখন বাজারে বিক্রি হচ্ছে মাছের কাটা মাথা বা উচ্ছিষ্ট অংশ বিশেষ, যা কেনার জন্য মানুষের ভিড় বাড়ছে। এটিই প্রমাণ করে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কতটা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

কৃষি খাতে হাহাকার : শহর যখন খরচের চাপে অস্থির, গ্রামের চিত্র আরও ভয়াবহ। ডিজেল সংকটে সেচ পাম্প চালানো দায় হয়ে পড়েছে। কাঠফাটা রোদে মাঠের ফসল যখন শুকিয়ে যাচ্ছে, তখন কৃষকের চোখে জল। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শুধু পরিবহন খরচ বাড়ে না, বাড়ে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচও। অথচ সেই অনুপাতে কৃষক দাম পায় না। শহর আর প্রান্তিকের পণ্যের দাম যখন সমান হারে বাড়ে, তখন সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়েন সেই কৃষক, যিনি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমাদের মুখে অন্ন জোগান।

পরিসংখ্যানে দারিদ্র্যের ক্ষত : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, ২০২২ সালে দারিদ্র্য হ্রাসের হার ১৮.৭ শতাংশে নেমে এলেও ২০২৫ সালে তা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১.২ শতাংশে। সরকারি হিসাবে দরিদ্রসীমার নিচে থাকার যে সংজ্ঞা, বর্তমান বাজার দরে তা একপ্রকার হাস্যকর। সরকারি সংজ্ঞা: মাসে গড়ে ৩,৮২২ টাকা খরচের সামর্থ্য না থাকলে তিনি দরিদ্র। বাস্তবতা: বর্তমান বাজারে এই টাকা দিয়ে একটি পরিবারের এক মাসের গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি আর ভোজ্য তেলের বিল পরিশোধ করাই অসম্ভব। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের আয়ের ৪২ শতাংশ চলে যাচ্ছে শুধু খাদ্যদ্রব্য কিনতে। বাকি ৫৮ শতাংশ দিয়ে শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত এবং ঘরভাড়া মেটানো এখন ‘অসম্ভব মিশন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে একটি পরিবারের ন্যূনতম খরচ প্রয়োজন ৫৯ হাজার টাকা, সেখানে অধিকাংশ চাকরিজীবীর বেতন বা ব্যবসায়ীর আয় এর অর্ধেকও নয়।

বেকারের মিছিল : ২০২৪ সালে যেখানে ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ কাজ হারিয়েছেন, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসেই সেই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১ লাখে। শিল্প মালিকদের দেয়া এই তথ্য ভয়াবহ এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শহীদুল জাহীদ সতর্ক করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সেখানকার মজুরি খরচ বাড়বে এবং অনেক প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরতে বাধ্য হবেন। এতে রেমিট্যান্স কমবে এবং দেশে বেকারের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর প্রভাব : আর্থিক টানাপোড়েনের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে শিশুরা। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো খরচ কমাতে গিয়ে প্রথমেই কোপ দিচ্ছে শিক্ষার বাজেটে। অনেক শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে শ্রমবাজারে যোগ দিতে। শুধু তাই নয়, প্রোটিন বা পুষ্টিকর খাবারের বদলে শুধু কার্বোহাইড্রেট খেয়ে বড় হওয়া এই প্রজন্ম ভবিষ্যতে শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে, যা দেশের সার্বিক উৎপাদনশীলতাকে দীর্ঘমেয়াদে আঘাত করবে।

বিশ্লেষকদের মতামত ও করণীয় : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকীর মতে, যারা এরই মধ্যে গরিব ছিলেন, তারা এখন দারিদ্র্যসীমার আরও নিচে চলে যাচ্ছেন। একে বলা হয় ‘ক্রনিক পভার্টি’ বা দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্য।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

শ্রেণিভিত্তিক সঠিক পরিসংখ্যান: সরকার কার জন্য ভর্তুকি দিচ্ছে এবং কারা প্রকৃত সুবিধাবঞ্চিত, তার সঠিক তথ্যভাণ্ডার তৈরি করতে হবে। বাজার মনিটরিং: কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যারা দাম বাড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষিতে বিশেষ ভর্তুকি: জ্বালানি ও সারের দাম কমিয়ে উৎপাদন খরচ কমানোর বিকল্প নেই। মজুরি কাঠামো পুনর্বিবেচনা: মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের এই টালমাটাল অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে মধ্যবিত্তের ‘নতুন বাস্তবতা’ কেবল টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং এক অদৃশ্য সামাজিক রূপান্তরের গল্প। যে শ্রেণিটি একসময় দেশের সংস্কৃতির ধারক এবং অর্থনীতির চালিকাশক্তি ছিল, আজ তারা ক্রমাগত সংকুচিত হতে হতে খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা থেকে শুরু করে নিত্যপণ্যের বাজারের সিন্ডিকেট সবকিছুর চূড়ান্ত দায়ভার যেন এসে চেপেছে এই স্বল্প ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষগুলোর কাঁধে।

তবে এই সংকটের অন্ধকারেই লুকিয়ে আছে ঘুরে দাঁড়ানোর সংকল্প। মধ্যবিত্ত এখন মিতব্যয়িতার নতুন পাঠ নিচ্ছে, বিলাসিতা বিসর্জন দিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জীবন সাজাতে শিখছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, একটি জাতির মেরুদণ্ড যদি দীর্ঘসময় চাপের মুখে পিষ্ট হয়, তবে সামগ্রিক উন্নয়ন টেকসই হওয়া কঠিন। তাই কেবল ব্যক্তি পর্যায়ের প্রচেষ্টায় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই শ্রেণির জন্য সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। নোনা পানির আগ্রাসন যেমন উপকূলকে গ্রাস করছে, তেমনি মূল্যস্ফীতির আগ্রাসন যেন মধ্যবিত্তের স্বপ্নকে গ্রাস করতে না পারে- সেদিকে নজর দেয়াই হোক আগামীর লক্ষ্য। মধ্যবিত্তের এই নীরব সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে আমাদের আগামীর অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের ওপর।

Link copied!