নিজস্ব প্রতিবেদক
মে ৩, ২০২৬, ১২:৩৭ এএম
রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোয় এখন আর সেই রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা নেই। নেই শত শত মোটরসাইকেল আর প্রাইভেটকারের দীর্ঘ সারি। গত কয়েক দিন ধরেই ঢাকার পাম্পগুলোয় ফিরেছে স্বাভাবিক চিত্র।
বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন) এবং পাম্প মালিকরা বলেন, মূলত বাজারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সরবরাহ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়ায় দুই মাসের অস্থিরতা এখন পুরোপুরি কেটে গেছে।
সরবরাহ বৃদ্ধি- চাহিদার চেয়েও বেশি তেল বাজারে : বিপিসির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সংকট কাটাতে গত ১০ দিনে বাজারে রেকর্ড পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হয়েছে। অকটেন: গত বছরের এপ্রিলের তুলনায় এ বছর অকটেনের সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। দিনে গড়ে ১,৭৮০ টন অকটেন সরবরাহ করা হয়েছে, যা আগে ছিল মাত্র ১,১২৯ টন। ডিজেল: ২০ এপ্রিলের পর থেকে ডিজেলের সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়িয়ে প্রতিদিন গড়ে ১৩,৪৬৩ টন করা হয়েছে। পেট্রল: পেট্রলের সরবরাহ গত বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে এখন প্রতিদিন ১,৫৮১ টনে দাঁড়িয়েছে। পদ্মা তেল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান জানান, মানুষ এখন পাম্পে গিয়ে অনায়াসেই তেল পাচ্ছে, ফলে আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনার প্রবণতা কমে গেছে।
মূল্যের সমন্বয় ও মজুতপ্রবণতা হ্রাস : গত ১৮ এপ্রিল সরকার জ্বালানি তেলের দাম পুনর্নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ এবং পেট্রল ১৩৫ টাকা করা হয়।
তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘অহেতুক মজুত’ করার মানসিকতা কমেছে। পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, ‘তেলের স্বল্পতা থাকলে মানুষ ভীতি থেকে বেশি কেনে। সরবরাহ বাড়ার পর সেই ভীতি কেটে গেছে।’ এ ছাড়া দাম বাড়ার ফলে কালোবাজারে তেল বিক্রির মুনাফাও কমেছে, যা অবৈধ মজুতদারদের নিরুৎসাহিত করেছে।
ফুয়েল পাস ব্যবস্থা ও নজরদারি : জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা আনতে সরকারের চালু করা ফুয়েল পাস ব্যবস্থা যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে। এই কার্ডের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট গাড়ি কতটুকু তেল নিচ্ছে তা ডিজিটালভাবে ট্র্যাকিং করা হচ্ছে। এতে একই গাড়ি বারবার লাইনে দাঁড়িয়ে ড্রামে বা বালতিতে তেল নিয়ে মজুত করার সুযোগ হারিয়েছে। পাশাপাশি সারা দেশে জেলা প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান অবৈধ মজুতদারদের কোণঠাসা করে ফেলেছে।
যুদ্ধবিরতি ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। দেশেও এর প্রভাব পড়ে এবং মানুষের মধ্যে সরবরাহ বন্ধ হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। তবে সম্প্রতি অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে। এই আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা দেশের গ্রাহকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা কমিয়ে দিয়েছে।
মজুত ও মে মাসের পূর্বাভাস : বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। ডিজেল: বর্তমানে মজুত আছে ১ লাখ ৮১ হাজার টন। খালাসের অপেক্ষায় আছে আরো ১ লাখ টনের বেশি। অকটেন: মে মাসের চাহিদা ৩৭ হাজার টনের বিপরীতে মজুত আছে প্রায় ৪৩ হাজার টন।
পেট্রল: মজুত আছে প্রায় ১৮ হাজার টন। বিপিসি প্রধান আশ্বস্ত করেছেন যে, জুলাই-ডিসেম্বর প্রান্তিকের জন্য তেল আমদানির দরপত্র ইতোমধ্যে আহ্বান করা হয়েছে, তাই সামনের মাসগুলোয় সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটবে না।
সর্বোপরি, ঢাকার পাম্পগুলোর বর্তমান চিত্র বলছে, সঠিক সময়ে সরবরাহ বৃদ্ধি এবং কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি যেকোনো কৃত্রিম সংকট মোকাবিলায় সক্ষম।
তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হলে বিশ্ববাজারের সাথে সমন্বয় রেখে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে এবং নজরদারিতে কোনো ঢিলেমি দেয়া যাবে না।