নিজস্ব প্রতিবেদক
মে ৮, ২০২৬, ১২:২৫ এএম
ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে আধুনিক রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার যে পরিকল্পনা একসময় উচ্চ প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, তা বাস্তবে দীর্ঘসূত্রতা ও ধীরগতির কারণে এখন অনিশ্চয়তার মুখে। দ্রুতগতির ট্রেন চালু এবং ভবিষ্যতে বিদ্যুৎচালিত রেলের সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে শুরু হওয়া ডুয়েলগেজ রেললাইন প্রকল্পটি এক দশকের বেশি সময় পেরিয়েও সম্পূর্ণ হয়নি।
সময় বাড়তে বাড়তে এখন প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল প্রায় ১৪ বছরে পৌঁছানোর পথে, যা এর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। ২০১৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটি প্রথমে ২০১৭ সালের মধ্যেই শেষ হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করার পর একাধিক ধাপে এর মেয়াদ বাড়ানো হয়-২০১৯, ২০২০, ২০২১ ও ২০২২ পার হয়ে শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়। এখন আবার দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে তা ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। ফলে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সময়কাল দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৪ বছর, যা একটি মাঝারি আকারের অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ।
প্রকল্পের আওতায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে বিদ্যমান মিটারগেজ লাইনের পাশাপাশি ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণের কাজ চলছে। মোট ২৩ দশমিক ৪১ কিলোমিটার মূল লাইন এবং ৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার লুপ লাইনকে এই ব্যবস্থায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে একই লাইনে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ ট্রেন চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এতে ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে বর্তমান প্রায় ৩২টি থেকে ৭৬টিতে উন্নীত করা সম্ভব হবে এবং যাতায়াত সময়ও কমে আসবে।
তবে বাস্তব চিত্র বলছে, প্রকল্পের অগ্রগতি সেই লক্ষ্য অনুযায়ী এগোয়নি। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, বাস্তব অগ্রগতি প্রায় ৫৫ শতাংশ হলেও আর্থিক অগ্রগতি ৩৭ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ কাজের তুলনায় ব্যয়ের এই পার্থক্য প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতার ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কেউ কেউ এটিকে পরিকল্পনার ঘাটতি বা বাস্তবায়ন বিলম্বের লক্ষণ হিসেবেও দেখছেন।
ব্যয়ের কাঠামোয়ও রয়েছে অসঙ্গতি। মোট ৬৬৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পে সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি বৈদেশিক সহায়তাও রয়েছে। তবে সম্প্রতি সংশোধনী প্রস্তাবে সিভিল ওয়ার্কস খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন ব্যাখ্যা চেয়েছে। একই সময়ে সিগন্যালিং ও টেলিকম খাতে ব্যয় কমানো হলেও সিভিল অংশে কেন এমন বৃদ্ধি-তার যৌক্তিকতা স্পষ্ট নয়।
শুধু ব্যয় নয়, প্রকল্পের বিভিন্ন খাতেও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশোধিত প্রস্তাবে ভ্রমণ, বিনোদন, কম্পিউটার সরঞ্জাম এবং আইনসংক্রান্ত ব্যয়ের মতো নতুন খাত যুক্ত করা হয়েছে, যা আগে ছিল না। এসব ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা এবং অর্থের উৎস নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ‘জেনারেল প্রভিশন’ খাতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখার বিষয়টিও পরিষ্কার ব্যাখ্যা ছাড়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনায়ও রয়েছে অস্পষ্টতা। কোন কাজ কখন এবং কীভাবে সম্পন্ন হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা না থাকায় বাস্তবায়নের গতি আরও ধীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণেও এই বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
রেল পরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পটির ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে ঠিকাদারি জটিলতা সামনে এসেছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে চীনা ঠিকাদার কাজ অসমাপ্ত রেখে চলে যাওয়ার ঘটনা বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। কেন তারা কাজ ছেড়ে গেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে-এসব বিষয় এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। বিষয়টি তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং নতুন করে দরপত্র আহ্বানের প্রয়োজনীয়তার কারণে কাজের গতি কমে যায়। তবে নতুন করে সরঞ্জাম সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হলে শিগগিরই কাজের গতি বাড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এই প্রকল্পের গুরুত্ব নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।
ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হওয়ায় এই রুটে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ যাতায়াত করে। সড়কপথে যানজটের কারণে দীর্ঘ সময় লাগায় রেলপথকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনেক আগে থেকেই ছিল। একই সঙ্গে পণ্য পরিবহন সহজ হলে শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জ থেকে রাজধানী ও অন্যান্য এলাকায় সরবরাহ ব্যবস্থাও আরও গতিশীল হওয়ার কথা।
কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা ও বাস্তবায়ন জটিলতার কারণে সেই সম্ভাবনা এখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুতেই যথাযথ সমীক্ষা ও পরিকল্পনা না থাকায় পরে বারবার সংশোধনের প্রয়োজন হয়েছে। এতে সময় যেমন বেড়েছে, তেমনি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ওপর চাপও বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বড় প্রকল্পে সময় ও ব্যয়ের এই ধরনের বিচ্যুতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, আস্থার সংকটও তৈরি করে। তাদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের দীর্ঘসূত্রতা এড়ানো যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, প্রকল্পের ব্যয় ও সময়-দুই ক্ষেত্রেই সতর্কতা জরুরি। বিশেষ করে ঠিকাদারি জটিলতা ও কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনার পেছনের কারণ খুঁজে বের করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় এ ধরনের প্রকল্পে অনিয়ম ও অপচয় ঠেকানো কঠিন হবে।
সব মিলিয়ে, একটি গুরুত্বপূর্ণ রেল যোগাযোগ প্রকল্প দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকায় এর সম্ভাব্য সুফল যেমন বিলম্বিত হচ্ছে, তেমনি প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে প্রকল্পটিকে কার্যকর করা না গেলে এর আর্থিক ও সামাজিক গুরুত্ব অনেকটাই ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।