ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পাল্লা ভারি

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

মে ৯, ২০২৬, ১২:২৪ এএম

আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পাল্লা ভারি

বাজারে গেলেই পকেটে টান পড়ছে সাধারণ মানুষের। চাল থেকে চিনি, শাকসবজি থেকে মাছ-মাংস সবকিছুর দামই এখন আকাশচুম্বী। একদিকে সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতির পারদ চড়ছে, অন্যদিকে বাস্তবের বাজারে সেই পরিসংখ্যানের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে ভোক্তাদের। সীমিত আয়ের মানুষ এখন শুধু হিমশিমই খাচ্ছে না, আক্ষরিক অর্থেই খরচের চাপে চ্যাপ্টা হয়ে পড়েছে। ঢাকার খুচরা বাজারে সপ্তাহের ব্যবধানে আবারও বাড়তি চাপ পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন সবজির বাজারে নতুন করে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়ার প্রভাব খুচরা বাজারে পড়েছে। তবে মুরগির বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। সোনালি ও ব্রয়লার মুরগির দাম কমেছে কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর তালতলা ও আগারগাঁওয়ের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ সবজির দাম গত সপ্তাহের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

ক্রেতারা বলছেন, প্রতিদিন বাজারে এসে নতুন দামের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। বর্তমানে করলা বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। ঢেঁড়সের দাম বেড়ে হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। পটল ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং বরবটি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেগুনের দামও বেড়েছে, মানভেদে প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১৪০ টাকা পর্যন্ত রাখা হচ্ছে। কচুর লতি, চিচিঙ্গা ও ধুন্দলের দামও আগের তুলনায় বেশি।

সবজির পাশাপাশি কাঁচামরিচের বাজারেও ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে বর্তমানে কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। দেশি শসার দাম বেড়ে হয়েছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা, যদিও হাইব্রিড শসা কিছুটা কম দামে ৮০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে কাঁচা আম ৩০ থেকে ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

অন্যদিকে লেবুর বাজারে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। আকারভেদে প্রতি হালি লেবু ১০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শাকজাতীয় পণ্যের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও ধনেপাতা এখনো চড়া। দেশি ধনেপাতা কেজি ১৮০ টাকা এবং হাইব্রিড ধনেপাতা ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মুরগির বাজারে গত কয়েক সপ্তাহের অস্থিরতা কমতে শুরু করেছে। সোনালি মুরগির দাম কেজিতে ৩০ টাকা কমে ৩৩০ টাকায় নেমেছে। ব্রয়লার বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায়, যা গত সপ্তাহের তুলনায় ১০ টাকা কম। এছাড়া লাল লেয়ার ৩১০ টাকা, সাদা লেয়ার ২৯০ এবং দেশি মুরগি ৭৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

মাংসের বাজারে তেমন পরিবর্তন দেখা যায়নি। গরুর মাংস প্রতি কেজি ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১,২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাছের বাজারেও বেশিরভাগ প্রজাতির দাম আগের অবস্থানে রয়েছে, তবে রুই মাছের দাম কিছুটা বেড়েছে। আকারভেদে রুই বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকায়। ইলিশের দামও উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে। এদিকে ডিমের বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

এক ডজন লাল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, খামার পর্যায়ে দাম বাড়ায় খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। বাজার করতে আসা সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, আয় না বাড়লেও নিত্যপণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন।

পরিসংখ্যানে উদ্বেগ- ফের ৯ শতাংশের ঘরে মূল্যস্ফীতি : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিলে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.০৪ শতাংশে। মার্চ মাসে এটি ছিল ৮.৭১ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি ০.৩৩ শতাংশ বেড়েছে। এর মানে হলো, গত বছর এপ্রিলে যে পণ্য ১০০ টাকায় কেনা যেত, এখন তা কিনতে খরচ হচ্ছে ১০৯ টাকার বেশি। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির ওপর বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।

বাজার বিশ্লেষণ- ৩ মাসে পণ্যের দামের অস্বাভাবিক উল্লম্ফন : গত তিন মাসের বাজার দর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কিছু কিছু পণ্যের দাম অকল্পনীয় হারে বেড়েছে।

পণ্যের নাম

  • বৃদ্ধির হার বর্তমানে (কেজি/লিটার/ডজন) কাঁচা পেঁপে ১৫০% - ১৬৭% ৮০ - ১০০ টাকা
  • বেগুন ৬০% - ১০০% ৮০ - ১২০ টাকা
  • এলপিজি (১২ কেজি) ৪৩% ২,১০০ - ২,২০০ টাকা (সরকার নির্ধারিত ১,৯৪০)
  • মুরগির ডিম (ডজন) ২১% - ২২% ১৪০ - ১৪৫ টাকা
  • সয়াবিন তেল (বোতল) ৩% - ৬% ২০০ টাকা
  • চাল (মাঝারি) ৩% ৬০ - ৬৮ টাকা

জীবনযাত্রায় প্রভাব- পুষ্টি কাটছাঁট করছে মধ্যবিত্ত : খরচ সামলাতে না পেরে অনেক পরিবার তাদের প্রতিদিনের খাদ্য তালিকা থেকে আমিষ ও পুষ্টিকর খাবার বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে। বাড্ডার বেসরকারি চাকরিজীবী ইকরামুল হকের ভাষ্যমতে, আগে রুই-কাতলা কিনতাম, এখন পাঙাশ-তেলাপিয়াই ভরসা। সন্তানদের ভালো-মন্দ খাওয়ানো এখন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডাক্তারদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি এই পুষ্টিহীনতা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং শারীরিক সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।

কেন কমছে না দাম; অজুহাতের পাহাড় : ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা দাম বাড়ার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন- জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি: ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ায় পরিবহন ভাড়া কয়েকগুণ বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রতিটি পণ্যের ওপর। আকস্মিক বন্যা ও বৃষ্টি: সুনামগঞ্জসহ দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যা এবং অতিবৃষ্টির কারণে সবজির সরবরাহ কমে গেছে। আন্তর্জাতিক অস্থিরতা: ইরান-ইসরাইল উত্তেজনা এবং লোহিত সাগরের সংকটের দোহাই দিয়ে আমদানিকৃত পণ্যের দাম বাড়ানো হচ্ছে। চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগী: পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে পৌঁছাতে কয়েক স্তরের চাঁদাবাজি এবং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দামকে সাধারণের নাগালের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকদের পরামর্শ ও করণীয় : কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা ভ্যাট, ট্যাক্স বা রাজনৈতিক চাঁদার অজুহাতে দাম বাড়ালেও ভোক্তা সুরক্ষায় কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে এবং টিসিবির কার্ড সুবিধা না বাড়ালে নিম্নবিত্তের জীবন আরও সংকটাপন্ন হবে।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরির মতে- পাইকারি পর্যায়ের মনোপলি বা একক আধিপত্য ভাঙতে হবে, নিত্যপণ্যের আমদানিতে শুল্ক ও কর সাময়িকভাবে প্রত্যাহার বা হ্রাস করতে হবে, কৃষিপণ্য সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর চ্যানেল শক্তিশালী করতে হবে, কঠোর বাজার তদারকি এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

সর্বোপরি, ঢাকা থেকে গ্রাম সর্বত্রই এখন হাহাকার। সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। কেবল সভা-সেমিনার বা তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, এই মুহূর্তে প্রয়োজন দৃশ্যমান বাজার তদারকি এবং নিত্যপণ্যের দাম কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ। তা না হলে বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে খাদ্য নিরাপত্তা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে।

Link copied!