ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

রূপপুরে পরমাণু ঝুঁকির অবসান

মো. নেয়ামত উল্যাহ

মো. নেয়ামত উল্যাহ

মে ১২, ২০২৬, ১২:১৮ এএম

রূপপুরে পরমাণু ঝুঁকির অবসান

পারমাণবিক শক্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে শঙ্কা থাকাটা অমূলক নয়। চেরনোবিল কিংবা ফুকুশিমার মতো অতীত বিপর্যয়গুলো বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, সামান্যতম ত্রুটিও কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তবে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।

এখানে ব্যবহূত হয়েছে রুশ প্রযুক্তির সর্বাধুনিক ‘থ্রি-প্লাস (৩+)’ প্রজন্মের ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর, যা মূলত নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ডিজাইন করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে রূপপুরে পারমাণবিক ঝুঁকির এক প্রকার অবসান ঘটেছে।

রূপপুরের এই অত্যাধুনিক সুরক্ষা ব্যবস্থার মূলে রয়েছে এর পাঁচ স্তরের প্রতিরক্ষাবলয় এবং সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক অনন্য সমন্বয়। বিশেষ করে, চরমতম দুর্ঘটনায় রিঅ্যাক্টরের গলিত কোরকে আটকে ফেলার জন্য এখানে যুক্ত করা হয়েছে ‘কোর ক্যাচার’ নামক বিশেষ পাত্র, যা পূর্ববর্তী অনেক প্রযুক্তিতে ছিল না।

এর বাইরেও রিঅ্যাক্টর ভবনটি এমনভাবে ডাবল কন্টেইনমেন্ট বা দ্বৈত দেয়ালে আবৃত, যা ৮ মাত্রার ভূমিকম্প, শক্তিশালী সাইক্লোন কিংবা সরাসরি বিমান হামলার আঘাত সইতেও সক্ষম। অর্থাৎ, কারিগরি ত্রুটি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ যে কোনো চরম পরিস্থিতিতেও তেজস্ক্রিয়তা বাইরে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। মূলত এই অভাবনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই বাংলাদেশ আজ পরমাণু শক্তিকে ভয় হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম নিরাপদ হাতিয়ার হিসেবে বরণ করে নিয়েছে।

থ্রি-প্লাস প্রযুক্তি, কেন এটি আলাদা : পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিবর্তন বুঝতে হলে এর প্রজন্মগুলো বুঝতে হবে। চেরনোবিলের রিঅ্যাক্টর ছিল দ্বিতীয় প্রজন্মের, আর ফুকুশিমার প্রযুক্তি ছিল মূলত দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের মিশ্রণ। রূপপুরের প্রযুক্তি গত দশকের (২০১৫ সালের ডিজাইন) সর্বাধুনিক সংস্করণ।

ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টরের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো- সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় সুরক্ষা: সাধারণবিদ্যুৎকেন্দ্রে দুর্ঘটনা ঘটলে তা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিদ্যুৎ বা পাম্পের প্রয়োজন হয় (সক্রিয় ব্যবস্থা)। কিন্তু রূপপুরে এমন কিছু ব্যবস্থা আছে যা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বা প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহ ব্যবহার করে রিঅ্যাক্টরকে ঠান্ডা রাখবে (নিষ্ক্রিয় ব্যবস্থা)।

কোর ক্যাচার: এটি থ্রি-প্লাস প্রযুক্তির একটি অনন্য সংযোজন। যদি কোনো চরম দুর্ঘটনায় রিঅ্যাক্টরের কোর গলে যায়, তবে সেই গলিত লাভা বা ‘কোরিয়াম’ যাতে মাটির নিচে বা ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশতে না পারে, সেজন্য রিঅ্যাক্টরের নিচে একটি বিশেষ পাত্র বা ‘কোর ক্যাচার’ রাখা হয়েছে। এটি তেজস্ক্রিয় পদার্থকে আটকে ফেলে ঠাণ্ডা করে দেবে।

পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা প্রাচীর : রুশ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রোসাটমের মতে, রূপপুরে তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর পথ রোধ করতে পাঁচ স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। স্তরের নাম, কাজ ও বৈশিষ্ট্য- ১. ফুয়েল ম্যাট্রিক্স ইউরেনিয়াম জ্বালানিকে এমনভাবে সিরামিক ট্যাবলেটে রাখা হয় যা তেজস্ক্রিয়তা বাইরে আসতে দেয় না।

২. ফুয়েল ক্ল্যাডিং জ্বালানি ট্যাবলেটগুলো বিশেষ জিরকোনিয়াম অ্যালয়ের টিউবে সিল করা থাকে।

৩. রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল অত্যন্ত শক্তিশালী ইস্পাতের পাত্র, যা উচ্চ চাপ ও তাপ সহ্য করতে সক্ষম।

৪. ইনার কন্টেইনমেন্ট ১.৫ মিটার পুরুত্বের কংক্রিটের দেয়াল, যা তেজস্ক্রিয়তা ভেতরে আটকে রাখে।

৫. আউটার কন্টেইনমেন্ট এটি বাইরের স্তর, যা বাইরের হামলা থেকে রিঅ্যাক্টরকে রক্ষা করে।

দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতা : বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রূপপুর কেন্দ্রটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যা চরম পরিস্থিতিতেও অক্ষত থাকবে— ভূমিকম্প: রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পেও কেন্দ্রের কোনো ক্ষতি হবে না। বিমান হামলা: একটি বিশাল যাত্রীবাহী বিমান যদি সরাসরি রিঅ্যাক্টর ভবনে আছড়ে পড়ে, তবুও এর ডাবল কন্টেইনমেন্ট দেয়াল ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করতে পারবে না। বন্যা ও সাইক্লোন: পদ্মা নদীর উচ্চতম জোয়ার বা ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় এর উচ্চতা ও কাঠামো বিশেষভাবে তৈরি।

দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও আগামীর চ্যালেঞ্জ : প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের ভুল বা অব্যবস্থাপনা বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম মনে করেন, যন্ত্রের পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ‘আমাদের রিঅ্যাক্টর ডিজাইন আধুনিক, কিন্তু এটি পরিচালনার জন্য যে কয়েক হাজার দক্ষ প্রকৌশলী ও অপারেটর প্রয়োজন, তাদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও কঠোর শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে।’

অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সম্ভাবনা : আগামী আগস্ট মাস নাগাদ জাতীয় গ্রিডে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ দুটি ইউনিট থেকে মোট ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। স্থায়িত্ব: এই কেন্দ্র থেকে অন্তত ৬০ বছর নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, যা প্রয়োজনে ৮০ বছর পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব। পরিবেশ: পারমাণবিক বিদ্যুৎ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করে না, ফলে এটি বাংলাদেশের ‘নেট জিরো’ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে।

পরিশেষে বলা যায়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার স্তম্ভ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক মানদণ্ডে একটি নিরাপদ ও আধুনিক প্রযুক্তির মাইলফলক। চেরনোবিল বা ফুকুশিমার মতো অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে থ্রি-প্লাস প্রজন্মের যে সুরক্ষা বলয় এখানে গড়ে তোলা হয়েছে, তা পরমাণু ঝুঁকির প্রচলিত শঙ্কাকে বৈজ্ঞানিকভাবেই দূর করেছে।

রিঅ্যাক্টরের নিজস্ব নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য এবং স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কেন্দ্রটিকে যে কোনো মানবসৃষ্ট বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। তবে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ উৎকর্ষের পাশাপাশি এর দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে দক্ষ পরিচালনা ও কঠোর তদারকি কাঠামোর ওপর।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার গাইডলাইন এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে রূপপুর হবে বাংলাদেশের জন্য পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী বিদ্যুতের এক অক্ষয় উৎস। শঙ্কা কাটিয়ে বিজ্ঞানের এই আশীর্বাদকে আলিঙ্গন করার মাধ্যমে বাংলাদেশ যে পরমাণু যুগে প্রবেশ করেছে, তা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি উজ্জ্বল, নিরাপদ এবং লোডশেডিংমুক্ত উন্নত রাষ্ট্র গড়ার পথ প্রশস্ত করবে।

Link copied!