আমার সংবাদ ডেস্ক
নভেম্বর ২৪, ২০২৫, ১০:৪৯ পিএম
বাংলাদেশ–মিয়ানমার উপকূলীয় জলসীমা দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক ও আন্তঃসীমান্ত চোরাচালানের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে পরিচিত। বিশেষ করে সমুদ্রপথে পণ্য পাচার এবং বিনিময়ে মাদক ঢোকার প্রবণতা বাড়তে থাকায় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ক্রমাগত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
সেই ধারাবাহিকতায় সোমবার সকালে কোস্টগার্ডের একটি বিশেষ অভিযানে ধরা পড়েছে বড় একটি চোরাকারবারি চক্র। মাদক বিনিময়ে মিয়ানমারে পাচারের জন্য প্রস্তুতকৃত ৪৫০ বস্তা সিমেন্ট জব্দ করা হয়েছে, আটক করা হয়েছে ৯ জনকে। গোপন তথ্যেই শুরু বিশেষ অভিযান।
কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে পণ্য পাঠিয়ে তার বিনিময়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা ও বিভিন্ন ধরনের বিদেশি মদ আনার পরিকল্পনা করছিল একটি সংগঠিত চক্র। এই তথ্যের ভিত্তিতেই সকাল ৯টায় কোস্টগার্ডের জাহাজ ‘কামরুজ্জামান’ সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ-পূর্বে ছেঁড়াদ্বীপসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান নেয়।
এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে দেখা যায় ছোট আকারের ফিশিং ট্রলার ব্যবহার করে সীমান্তের অপর প্রান্তে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়। পাচারকারীরা কখনও মাছ ধরার আড়ালে ব্যবসা চালায়, আবার কখনো ফাঁকা বোটে সিমেন্ট, সার বা অন্যান্য পণ্য নিয়ে যায়। এবারও একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। কোস্টগার্ডের নজরে ধরা পড়ে সন্দেহভাজন ট্রলার।
অভিযান চলাকালে কোস্টগার্ডের টহলদল সমুদ্রের মাঝামাঝি অংশে একটি মাছ ধরার ট্রলারকে সন্দেহজনক গতিতে চলতে দেখে থামার নির্দেশ দেয়। নির্দেশ উপেক্ষা করলে জাহাজটি অনুসরণ করে ট্রলারটিকে ঘিরে ফেলে। পরে তল্লাশি চালাতে গিয়ে বেরিয়ে আসে পাচারের বিস্ময়কর তথ্য। ট্রলারে পাওয়া যায় ৪৫০ বস্তা সিমেন্ট যার বাজারমূল্য প্রায় দুই লাখ ৪৭ হাজার টাকা।
প্রথম দেখায় এগুলো সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য মনে হলেও জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সেগুলো মিয়ানমারে নিয়ে গিয়ে বিনিময়ে ইয়াবা ও মদ আনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পণ্য পাচারের আড়ালে মাদক বাণিজ্য। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বহুদিন ধরেই মাদক চক্রগুলো পণ্য বিনিময় পদ্ধতি ব্যবহার করে। কারণ, নগদ অর্থ লেনদেন করলে ধরা পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
অন্যদিকে সিমেন্ট, সার, ভোজ্যতেল বা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাঠিয়ে তাদের বিনিময়ে মাদক আনলে বিষয়টি ধরা পড়তে সময় লাগে।
কোস্টগার্ডের কর্মকর্তা জানান, এই চক্রটিও একই কৌশল অনুসরণ করছিল। তারা সিমেন্ট পাঠিয়ে তার বিনিময়ে উচ্চমূল্যের ইয়াবা এনে দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। এটি সফল হলে কয়েক কোটি টাকার মাদক দেশে প্রবেশ করত বলেও ধারণা করা হচ্ছে। আটক ৯ জন কারা? কোস্টগার্ড এখনো আটকদের বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশ করেনি।
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তারা সবাই ট্রলারটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। কেউ মাঝি, কেউ শ্রমিক আবার কেউ পাচার সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করত। জিজ্ঞাসাবাদে তারা মিয়ানমারসংশ্লিষ্ট একাধিক চক্রের নাম উল্লেখ করেছে বলে জানা গেছে। তদন্ত শেষ হলে বৃহত্তর নেটওয়ার্কটি প্রকাশ হতে পারে। চোরাচালানের পথ হিসেবে সেন্টমার্টিন–ছেঁড়াদ্বীপ অঞ্চল।
সেন্টমার্টিন ও ছেঁড়াদ্বীপের মধ্যবর্তী সমুদ্রপথ দীর্ঘদিন ধরে পাচারকারীদের অন্যতম নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কারণ, এ এলাকায় একদিকে পর্যটকের উপস্থিতির কারণে নৌযান চলাচল বেশি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক জলসীমা খুব কাছেই হওয়ায় পাচারকারীরা সুযোগ নেয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা ঢোকার হার বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীর দায়িত্বও বেড়েছে।
কোস্টগার্ড একাধিক অভিযান চালিয়ে ইয়াবার বড় চালান, সার, চিনি, ডাল এবং সিমেন্টসহ নানান পণ্য আটক করছে। এবারও সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই এই অভিযান পরিচালিত হয়। আইনগত প্রক্রিয়ায় যাচ্ছে মামলাটি।
জব্দকৃত ট্রলার, সিমেন্টের বস্তা এবং আটক ৯ জনকে কোস্টগার্ড শিগগিরই কক্সবাজার জেলা পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করবে। এরপর তাদের বিরুদ্ধে চোরাচালান ও মাদক আইনে মামলা দায়ের করা হবে।
অভিযান পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ জানান, পাচারকারীরা সাধারণত অত্যন্ত সংগঠিত হয়ে থাকে এবং তারা পণ্যের আড়ালে মাদক আনাকে ‘ঝুঁকিহীন’ মনে করে। কিন্তু কোস্টগার্ড নিয়মিত টহল জোরদার করায় এসব চক্রকে এখন আগেরচেয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কোস্টগার্ডের কঠোর অবস্থান।
কোস্টগার্ড কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক স্পষ্ট ভাষায় জানান, সমুদ্রে কোনো ধরনের চোরাচালান রোধে ভবিষ্যতেও কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, যে চক্রই হোক, যত বড়ই নেটওয়ার্ক থাকুক—সমুদ্রপথে মাদক বা পণ্য পাচার আমরা বরদাস্ত করব না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবসময় সতর্ক রয়েছে। এ ধরনের অভিযান কেবল মাদক পাচার বন্ধই করে না, বরং দেশের বৈধ পণ্যের বাজার রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চোরাচালান বেড়ে গেলে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্থ হন, সরকার রাজস্ব হারায় এবং মাদক ছড়িয়ে পড়লে সমাজে অপরাধ বাড়ে। তাই এই অভিযানকে কোস্টগার্ড সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করছে। উপকূলীয় অঞ্চলে আরও নজরদারির আহ্বান।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সেন্টমার্টিন–টেকনাফ উপকূল মাদক পাচারের হটস্পট হওয়ায় এখানকার নজরদারি আরও বাড়ানো জরুরি। উন্নত রাডার স্থাপন, ড্রোন টহল এবং রাতের বেলা যৌথ অভিযান বাড়ালে চক্রগুলো আরও দুর্বল হবে। একইসঙ্গে সীমান্তবর্তী জেলেদের সচেতন করা এবং জেলে ছদ্মবেশী পাচারকারীদের শনাক্ত করতেও সম্প্রদায়ভিত্তিক নজরদারি বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ইএইচ