আবিদ হাসান, হরিরামপুর, মানিকগঞ্জ
অক্টোবর ১৩, ২০২৫, ০১:৪৪ পিএম
‘মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান ২০২৫’-এর আওতায় চলতি বছরের ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন দেশের সব নদনদীতে ইলিশ মাছ আহরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাত ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হলেও মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে পদ্মার জেলেরা যেন আইনকেই চোখ রাঙাচ্ছেন।
প্রতিদিনই আইন অমান্য করে, দিনের আলো ও রাতের আঁধারে সংঘবদ্ধভাবে পদ্মানদীতে চলছে মা ইলিশ নিধনের মহোৎসব। জেলেদের এমন তাণ্ডব ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে উপজেলা মৎস্য বিভাগ। নিয়মিত অভিযান, জেল-জরিমানা ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের শাস্তিও যেন তাদের দমাতে পারছে না।
সাম্প্রতিক কয়েকদিনে সরেজমিনে হরিরামপুর উপজেলার হাতিঘাটা, কাঞ্চনপুর, কালিতলা, লেছড়াগঞ্জ, হরিণাঘাট, সেলিমপুরসহ বিভিন্ন ঘাটে দেখা গেছে, জেলেরা দলবেঁধে মা ইলিশ শিকার করছেন। স্থানীয়রা জানান, প্রকাশ্যেই বিকেল বা সন্ধ্যায় হাতিঘাটা বাজারে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা কেজি দরে ইলিশ বিক্রি হচ্ছে।
এমনকি, গত ১১ অক্টোবর দুপুরে কাঞ্চনপুর এলাকায় অভিযান চালাতে গিয়ে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের ওপর জেলেরা হামলা চালায় বলে জানা গেছে। পরে আরও জোরালো অভিযানে বেশ কয়েকজনকে মাছ ও জালসহ আটক করে সাজা দেওয়া হয়।
বিশেষ করে ফরিদপুর, গোয়ালন্দ, শিবালয়, রাজবাড়ির জেলেরা দেশীয় অস্ত্রসহ সংঘবদ্ধভাবে ইলিশ নিধনে জড়ো হচ্ছেন পদ্মায়।
রামকৃষ্ণপুর ইউপি’র বাসিন্দা মো. ইউসুফ বলেন, প্রতিদিনই আন্ধারমানিক ঘাটসহ বিভিন্ন পয়েন্টে মৎস্য অফিসের কর্মকর্তারা অভিযান চালাচ্ছেন। কিন্তু জেলেদের দৌরাত্ম্য কমছে না।
সেলিমপুর গ্রামের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জেলে বলেন, ২২ দিন না খাইয়া থাকমু? কেউ তো চাল দেয় না। জেল, জরিমানা হইলেও নদীতে নামছি। পেট তো অফিসাররা ভরাইয়া দিবে না।
হরিরামপুর উপজেলা ইলিশ প্রকল্পের ক্ষেত্র সহকারী মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা ইলিশ রক্ষায় জীবন বাজি রেখে অভিযান চালাচ্ছি। আমাদের ওপর হামলার পরও অভিযান থামেনি। আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে জেলা পর্যায়ে আলোচনা চলছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা নুরুল হক ইকরাম বলেন, জেলেরা যতই বেপরোয়া হোক, জাতীয় সম্পদ রক্ষায় আমরা আপসহীন। নিয়মিত অভিযান চলবে।
হরিরামপুর উপজেলা মৎস্য অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দিনে— ২৩টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। ১ লাখ ৫৪ হাজার মিটার কারেন্ট জাল ধ্বংস (বাজারমূল্য প্রায় ১৬.৫ লাখ টাকা)। ৭টি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত। ১৭টি নিয়মিত মামলা। ৫২ হাজার টাকা জরিমানা আদায়। ৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড। ৫৪ মণ ইলিশ জব্দ, যা স্থানীয় এতিমখানায় বিতরণ করা হয়েছে।
জাতীয় সম্পদ মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের ঘোষণা ও আইন প্রয়োগ যথেষ্ট হলেও মাঠপর্যায়ে তা কার্যকর করতে আরও সমন্বিত, কঠোর এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে। অন্যথায়, নিষেধাজ্ঞা কেবল কাগজে-কলমেই থেকে যাবে, আর পদ্মায় চলবে মা ইলিশ নিধনের বেপরোয়া মহোৎসব।
জেএইচআর