টাঙ্গাইল প্রতিনিধি
নভেম্বর ৮, ২০২৫, ০৬:১৪ পিএম
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর শনিবার টাঙ্গাইলে এক আঞ্চলিক সেমিনারে মন্তব্য করেছেন দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল আছে। রাজনীতি স্থিতিশীল থাকলে অর্থনীতি সামনে আরও ভালোভাবে চলবে।
প্রথম শুনলে বক্তব্যটি আশাবাদের মতো শোনায়, কিন্তু গভীরে তাকালে বোঝা যায়, এটি কেবল অর্থনীতির বিবরণ নয়, বরং দেশের আর্থিক নীতির অন্তর্নিহিত সংকেতও বহন করে।
‘স্থিতিশীল’ শব্দটি এখন নীতিনির্ধারক মহলে বহুল ব্যবহৃত। কিন্তু এই স্থিতিশীলতার মাপকাঠি কী? বাজারে মুদ্রাস্ফীতি দুই অঙ্কে, রিজার্ভ ক্রমহ্রাসমান, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে বিপজ্জনক পর্যায়ে এর পরও গভর্নরের মুখে ‘স্থিতিশীলতা’ শব্দটি উচ্চারিত হওয়া এক ধরনের আর্থিক আশাবাদী ভাষা, যা জনগণের আস্থার জন্য প্রয়োজনীয় হলেও, বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি করছে।
অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন, গভর্নরের এই মন্তব্যের মাধ্যমে বাজারে ‘মনস্তাত্ত্বিক স্থিতি’ আনার চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ, বাজার যেন আতঙ্কে না পড়ে, ব্যাংকিং সেক্টরে আমানতকারীরা আস্থা না হারান সেটাই মূল উদ্দেশ্য।
রাজনীতি স্থিতিশীল থাকলে অর্থনীতি ভালো চলবে এই বাক্যে মূল সংকেত রাজনৈতিক স্থিতির প্রয়োজনীয়তা। এতে গভর্নর একদিকে অর্থনীতির বাস্তব অবস্থা ব্যাখ্যা করেছেন, অন্যদিকে রাজনীতিকদের প্রতি এক নিঃশব্দ আহ্বান জানিয়েছেন।
অর্থনীতির গতি শুধু বাজেট বা রিজার্ভের ওপর নির্ভর করে না, বরং রাজনৈতিক স্থিরতা, আস্থা ও নীতি-নির্ধারণের ধারাবাহিকতার ওপর নির্ভরশীল।
২০২৪ সালের অর্থবছরের শুরু থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলার সংকট, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ এবং রপ্তানির মন্থরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক ধরনের চাপে ফেলে। এই প্রেক্ষাপটে গভর্নরের বক্তব্য আসলে বাজারে এক ধরণের ‘মনস্তাত্ত্বিক টনিক’ হিসেবে কাজ করতে পারে।
টাঙ্গাইলের ওয়াটার গার্ডেন রিসোর্টে অনুষ্ঠিত এমএফআই–ব্যাংক লিংকেজ বিষয়ক আঞ্চলিক সেমিনারে এই বক্তব্য দেন গভর্নর। এখানে আলোচ্য বিষয় ছিল কীভাবে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান (মাইক্রোক্রেডিট) ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে সহযোগিতার সেতুবন্ধন গড়ে তোলা যায়। মূল লক্ষ্য, গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সেবার সুযোগ বাড়ানো।
এ উদ্যোগের তাৎপর্য হলো অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পুঁজির প্রবাহ বৃদ্ধি করা। বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম প্রায় তিন দশক ধরে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। কিন্তু ব্যাংক খাতের সঙ্গে কার্যকর সংযোগের অভাবে এসব উদ্যোগ প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি পায়নি।
গভর্নরের উপস্থিতি ও মন্তব্যে তাই একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়— কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন ‘অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি’ বা financial inclusion-এর নতুন রূপরেখা তৈরি করছে।
বক্তৃতায় ড. আহসান এইচ মনসুর আরও বলেন, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ইংল্যান্ডে আইনজীবী পাঠানো হয়েছে। ক্লেম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। এই বক্তব্যে উঠে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ।
এটি শুধু আর্থিক প্রক্রিয়া নয়; বরং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রতিচ্ছবি। যেসব গোষ্ঠী বিদেশে বিপুল অর্থ পাচার করেছে, তাদের সম্পদ পুনরুদ্ধার করা এখন আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতার মধ্যে পড়েছে।
গভর্নরের এই মন্তব্যে বোঝা যায়, বাংলাদেশ এখন সক্রিয়ভাবে সেই প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করছে— যা দেশের আর্থিক স্বচ্ছতা পুনর্গঠনের পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে।
যদিও পুরো বক্তব্যে আশাবাদের ছায়া ছিল, তবু এর ভেতর লুকিয়ে আছে এক প্রকার নীরব সতর্কতা। ‘রাজনীতি স্থিতিশীল থাকলে’— এই শর্তের মাধ্যমে গভর্নর স্পষ্ট করেছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক স্থিতি অনেকটাই ‘রাজনৈতিক স্থিতির ওপর নির্ভরশীল’।
অর্থাৎ, আসন্ন নির্বাচনী সময়ের অস্থিরতা বা নীতিগত অচলাবস্থা যদি তৈরি হয়, তবে এই স্থিতিশীলতা খুব দ্রুত নড়বড়ে হতে পারে।
এই বক্তব্য তাই শুধুমাত্র ব্যাংকিং খাতের বিবৃতি নয়; এটি সরকারের কাছে এক নীতিগত বার্তা— রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা মানেই অর্থনীতিতে ঝুঁকি।
অর্থনৈতিক বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জের তালিকা
মুদ্রাস্ফীতি: ২০২৫ সালে খাদ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতিকে ৯ শতাংশের ওপরে রেখেছে।
ডলার সংকট: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে আসায় আমদানি ব্যয় মেটানো কঠিন হচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা: খেলাপি ঋণ বাড়ছে, অনেক ব্যাংক একীভূত হতে বাধ্য হচ্ছে।
রেমিট্যান্স প্রবাহের অস্থিরতা: হুন্ডির মাধ্যমে অর্থপাচার রেমিট্যান্সের প্রকৃত প্রবাহে প্রভাব ফেলছে।
গভর্নরের ‘স্থিতিশীল’ মন্তব্য এই বাস্তবতাকে ঢেকে দিতে নয়; বরং এর মধ্যেই এক ধরনের আত্মবিশ্বাসের বার্তা ছড়ানো— আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখেছি।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান প্রশাসন একদিকে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে, অন্যদিকে টাকার অবমূল্যায়ন নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডলার বিক্রি করছে— ফলে রিজার্ভে চাপ পড়ছে। তবু গভর্নরের বক্তব্যে বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
অনেক ব্যবসায়ী মনে করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নেতৃত্বের এমন আশাবাদ বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে সাধারণ জনগণ ভাবছেন স্থিতিশীলতার অর্থ যদি হয় ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রিত, আয় বাড়ছে, ও ব্যাংকে নিরাপদ আমানত রাখা যায়’— তবে সেই স্থিতিশীলতা এখনো তারা অনুভব করছেন না।
গভর্নরের বক্তব্যের গুপ্ত তত্ত্ব হলো অর্থনীতির ভারসাম্য কেবল সংখ্যায় নয়, বিশ্বাসে।
বিশ্বাস তৈরি হয় নীতিতে ধারাবাহিকতা ও প্রশাসনের স্বচ্ছতায়।
যদি রাজনৈতিক স্থিতি বজায় থাকে, তবে অর্থনীতি ধীরে ধীরে নিজস্ব গতি ফিরে পেতে পারে। তবে বাজারের চাপ, আন্তর্জাতিক ঋণ পরিশোধ, এবং মূল্যস্ফীতির স্থায়ী প্রভাব মোকাবিলায় আগামী ছয় মাস বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতির জন্য হবে এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
ড. আহসান এইচ মনসুরের বক্তব্য কেবল আশার বার্তা নয়; এটি নীতিনির্ধারক, রাজনীতিক ও
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক সেতুবিন্দুতে দাঁড়িয়ে একদিকে সম্ভাবনা, অন্যদিকে ঝুঁকি। স্থিতিশীলতা যদি শুধু পরিসংখ্যান না হয়ে বাস্তবে প্রতিফলিত হয়, তবে আগামী অর্থবছর হতে পারে নতুন অর্থনৈতিক জাগরণের সূচনা।
জেএইচআর