বগুড়া প্রতিনিধি
নভেম্বর ২৭, ২০২৫, ১১:৫১ পিএম
বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলায় স্ত্রী ও দুই শিশুকে হত্যার ঘটনায় সেনাবাহিনীর সদস্য শাহাদাত হোসেন কাজলকে গ্রেফতারের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া জোড়া শিশু হত্যা এবং মায়ের নির্মম মৃত্যু স্থানীয় এলাকায় আতঙ্ক ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে তাকে শাজাহানপুর থানা পুলিশ আদালতে হাজির করলে বিচারক কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। নিহত নারীর মা মোছা. রাবেয়া সুলতানার দায়ের করা মামলায় কাজলকে এক নম্বর আসামি করা হয়েছে। মামলায় আরও অজ্ঞাত তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
গত ২৫ নভেম্বর সকালে শাজাহানপুরের খলিশাকান্দি দহপাড়ায় শাহাদাত হোসেন কাজলের বাড়ির শয়নকক্ষে তিন জনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘরের ভেতর গলাকাটা অবস্থায় পাওয়া যায় কাজলের স্ত্রী সাদিয়া মোস্তারিম (২২), তিন বছরের শিশু সাইফা এবং মাত্র সাত মাসের সাইফ। তিনজনের মৃত্যু একসঙ্গে হওয়ায় ঘটনাস্থলেই শুরু হয় পুলিশের সূক্ষ্ম তদন্ত।
স্থানীয়দের দাবি, রাতের কোনো এক সময়ে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়। সকালে দরজা বন্ধ দেখে প্রতিবেশীরা সন্দেহ করেন এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা খবর দিলে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে। শিশু দুটির গলায় গভীর কাটা দাগ, আর সাদিয়ার গলায় আঘাতের চিহ্ন দেখে তদন্ত কর্মকর্তারা ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচনায় নেন।
মরদেহ উদ্ধারের পরপরই সেনা সদস্য শাহাদাতকে হেফাজতে নেয় শাজাহানপুর থানা পুলিশ। সে সময় তিনি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি বলে জানায় পুলিশ। পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এবং প্রাথমিক আলামত সংগ্রহ করে পুলিশের সন্দেহ আরও গাঢ় হয়।
নিহত সাদিয়ার মা রাবেয়া সুলতানা থানায় দায়ের করা মামলায় উল্লেখ করেন, পারিবারিক কলহের জেরে তার মেয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপের মধ্যে ছিলেন। সম্প্রতি সাদিয়ার সঙ্গে কাজলের সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়ে যায় বলেও আদালতকে জানান তিনি।
শাজাহানপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনাস্থলে পাওয়া আলামত ও মরদেহে পাওয়া আঘাতের ধরন থেকে বোঝা যায়, তিনজনকেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। দুই শিশুর গলায় গভীর কাটা দাগ ছিল এবং সাদিয়ার শরীরে একাধিক আঘাতচিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে হত্যার সময় ব্যবহার করা অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি।
এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের আগে বা পরে বাড়ির আশপাশে অন্য কারও উপস্থিতি ছিল কি না, সে বিষয়েও তদন্ত চলছে। মামলায় অজ্ঞাত তিনজনকে অন্তর্ভুক্ত করায় পুলিশ প্রতিবেশী ও পরিচিত কয়েকজনকেও জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
মামলার অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি শফিকুল ইসলাম জানান, কাজলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পর্কে ময়মনসিংহ সেনানিবাসে তার কর্মরত ইউনিটকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি নিকটবর্তী মাঝিড়া সেনানিবাসের কর্তৃপক্ষকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। সামরিক আইনের নিয়ম অনুযায়ী পুলিশের তদন্তের সঙ্গে সেনাবাহিনীও আনুষ্ঠানিক সমন্বয় করছে।
এ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে খলিশাকান্দি দহপাড়ায় নেমেছে নীরবতা। তিনজনের একসঙ্গে লাশ উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় গ্রামবাসী এখনও শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বিশেষ করে শিশুদের মৃত্যু সকলকে ব্যথিত করেছে। প্রতিবেশীরা জানান, সাদিয়া ও কাজলের মধ্যে কয়েক মাস ধরে দাম্পত্য কলহ চলছিল। তবে এমন ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা কেউ কল্পনাও করতে পারেননি।
এক প্রতিবেশী বলেন, ওদের সংসারে ঝামেলা ছিল ঠিকই, কিন্তু দুইটা ছোট বাচ্চাকে এমনভাবে মারা ফেলবে এটা ভাবতেই শিউরে উঠছি।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে ফরেনসিক ও আইও তদন্ত সমন্বয় করে কাজ করছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। কাজলের ভূমিকা, পারিবারিক বিরোধ, অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা এবং হত্যার উদ্দেশ্য সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ঘটনায় কাজলের কোনো সহযোগী ছিল কি না, হত্যাকাণ্ডের আগের রাতের কর্মকাণ্ড, মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড সব তথ্য সংগ্রহ করছে পুলিশ।
স্ত্রী ও দুই সন্তানের হত্যার অভিযোগে সেনা সদস্যের গ্রেফতার পুরো এলাকায় গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তিনটি প্রাণহানির এ ঘটনা বগুড়ায় সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। পুলিশ বলেছে, অপরাধী যেই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তদন্ত শেষ হলে হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ চিত্র প্রকাশ পাবে।