কক্সবাজার প্রতিনিধি
ডিসেম্বর ২৭, ২০২৫, ১২:২৬ পিএম
কক্সবাজারের পর্যটননির্ভর নৌযাত্রায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার সাক্ষী হলো দেশ। সেন্ট মার্টিন দ্বীপগামী একটি যাত্রীবাহী জাহাজে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় একজন কর্মচারীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। তবে সময়মতো আগুন লাগার বিষয়টি নজরে আসায় বড় ধরনের প্রাণহানি থেকে রক্ষা পেয়েছেন প্রায় দুই শতাধিক পর্যটক।
শনিবার সকালে কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছটা এলাকায় বাঁকখালী নদীর বিআইডব্লিউটিএ জেটিঘাটে ভেড়ার ঠিক আগমুহূর্তে আগুন ধরে যায় ‘এমভি আটলান্টিক ক্রুজ’ নামের জাহাজটিতে। সৌভাগ্যক্রমে ওই সময় জাহাজে কোনো যাত্রী উঠেননি। ফলে সম্ভাব্য ভয়াবহ বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, অগ্নিকাণ্ডের সময় জাহাজের একটি কেবিনে ঘুমিয়ে ছিলেন কর্মচারী নুর কামাল (৩৫)। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় তিনি বের হতে পারেননি। পরে উদ্ধারকারীরা তার পোড়া মরদেহ উদ্ধার করেন। ঘটনাটি পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নামিয়ে আনে।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, আগুন লাগার প্রকৃত কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাজটি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরুর মাত্র ১০–১৫ মিনিট আগেই এ দুর্ঘটনা ঘটে। প্রতিদিনের মতোই প্রায় ২০০ পর্যটক ওই জাহাজে ভ্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। যাত্রীরা তখন জেটিঘাটে অপেক্ষমান অবস্থায় ছিলেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, আগুন যদি কয়েক মিনিট পর লাগত, তাহলে যাত্রীরা জাহাজে উঠে পড়তেন। তখন পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারত।
আগুন লাগার খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে জেটিঘাটে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই শিশু ও নারী সদস্যদের নিয়ে দ্রুত নিরাপদ দূরত্বে সরে যান।
ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে আসা ব্যবসায়ী মীর আসলাম আমার সংবাদকে জানান, তিনি স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের উদ্দেশ্যে চার দিন আগেই টিকিট কেটেছিলেন। তিনি বলেন,
চোখের সামনে আগুনে জাহাজ পুড়তে দেখে বুক কেঁপে উঠেছিল। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করেছেন। একটু দেরি হলে কী হতো ভাবতেই ভয় লাগে।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট, কোস্টগার্ড, পুলিশ এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। তবে ততক্ষণে জাহাজটির বেশিরভাগ অংশ সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায়।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান দৈনিক আমার সংবাদকে বলেন বলেন, এটি একটি বড় সতর্কবার্তা। সৌভাগ্য যে যাত্রীরা জাহাজে ছিলেন না। আগুন লাগার কারণ খতিয়ে দেখা হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জাহাজ পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ও কক্সবাজার সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা তাসনিম দৈনিক আমার সংবাদ কে জানান, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটি পুরোপুরি অচল হয়ে গেছে। তবে আটলান্টিক ক্রুজের যাত্রীদের অন্য জাহাজে করে সেন্ট মার্টিন পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, পর্যটকদের ভোগান্তি এড়াতে বিকল্প জাহাজের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তাই আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শনিবার সকালে কক্সবাজার থেকে প্রায় দুই হাজার পর্যটক নিয়ে পাঁচটি জাহাজ সেন্ট মার্টিনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে এসব জাহাজ দুপুরের দিকে দ্বীপে পৌঁছানোর কথা।
প্রতিদিনের মতো বিকেলে আগের দিনের পর্যটকদের নিয়ে জাহাজগুলো কক্সবাজারে ফিরে আসবে। আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত এই রুটে টানা দুই মাস পর্যটক চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সেন্ট মার্টিন রুটে নৌযানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যাত্রীবাহী জাহাজে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, নিয়মিত তদারকি ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ আরও জোরদার করা জরুরি।
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, বিআইডব্লিউটিএ এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো নৌযান সেন্ট মার্টিন রুটে চলাচল করতে পারবে না। একই সঙ্গে পর্যটকদের বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড অনুমোদিত অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কিউআর কোডযুক্ত টিকিট সংগ্রহ করতে হবে।
একটি মুহূর্তের ব্যবধানে বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গেলেও একজন কর্মচারীর প্রাণহানি দেশকে নাড়া দিয়েছে। এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয় পর্যটন নিরাপত্তা শুধু সুযোগ-সুবিধার বিষয় নয়, এটি জীবন-মরণের প্রশ্ন। ভবিষ্যতে যেন এমন দুর্ঘটনা না ঘটে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আরও দায়িত্বশীল ও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা।