যশোর প্রতিনিধি
জানুয়ারি ৫, ২০২৬, ১১:০৫ পিএম
সীমান্তবর্তী জেলা যশোরের মণিরামপুরে এক চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
সোমবার সন্ধ্যায় উপজেলার ব্যস্ততম কপালিয়া বাজারে বরফকল ব্যবসায়ী এবং সাংবাদিক রানা প্রতাপ বৈরাগীকে (৩৮) ডেকে নিয়ে গিয়ে মাথায় গুলি করার পর গলা কেটে হত্যা করেছে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত। প্রকাশ্য দিবালোকে জনাকীর্ণ এলাকায় এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড সম্পন্ন করে খুনিরা অনায়াসে পালিয়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে।
নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগী যশোরের কেশবপুর উপজেলার আড়ুয়া গ্রামের তুষার কান্তি বৈরাগীর ছেলে। তিনি একদিকে মণিরামপুরের কপালিয়া বাজারে একটি বরফ তৈরির কারখানার মালিক ছিলেন, অন্যদিকে নড়াইল থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বিডি খবর’ নামক একটি আঞ্চলিক পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বিকেলে রানা প্রতাপ তার মালিকানাধীন বরফকলে দৈনন্দিন কাজ তদারকি করছিলেন। সন্ধ্যা ঘনানোর কিছুক্ষণ আগে, আনুমানিক ৫টা ৪৫ মিনিটের দিকে একটি মোটরসাইকেলে করে তিন যুবক সেখানে উপস্থিত হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, দুর্বৃত্তরা রানাকে অত্যন্ত পরিচিত ভঙ্গিতে বাইরে ডেকে নিয়ে যায়। তাদের সাথে কথা বলতে বলতে রানা কপালিয়া বাজারের পশ্চিম পাশে অবস্থিত ‘কপালিয়া ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার’ এর সামনের গলিতে প্রবেশ করেন। সেখানে পৌঁছানো মাত্রই কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগে খুনিরা তাকে লক্ষ্য করে পরপর তিনটি গুলি চালায়। একটি গুলি সরাসরি তার মাথায় বিদ্ধ হয়। রানা মাটিতে লুটিয়ে পড়লে মৃত্যু নিশ্চিত করতে দুর্বৃত্তরা তার গলা কেটে দিয়ে পালিয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে রাজপথ রক্তাক্ত হয়ে ওঠে এবং রানা প্রতাপ ঘটনাস্থলেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের পর কপালিয়া বাজার এলাকায় যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মতো নীরবতা নেমে আসে। আতঙ্কে দোকানিরা ঝটপট দোকান বন্ধ করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, খুনিরা মোটরসাইকেলে করে যে ক্ষিপ্রতায় আক্রমণ চালিয়েছে এবং যেভাবে এলাকা ত্যাগ করেছে, তাতে এটি একটি সুপরিকল্পিত পেশাদার ‘হিট’ বলে ধারণা করা হচ্ছে।
খবর পেয়ে মণিরামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রজিউল্লাহ খানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি শক্তিশালী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশ মৃতদেহটি উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করে। অভিযানে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন,।
মণিরামপুর থানার ওসি মো. রজিউল্লাহ খান সংবাদমাধ্যমকে জানান, নিহত রানা প্রতাপের শরীরে তিনটি গুলির ক্ষত পাওয়া গেছে এবং তার গলা ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় ছিল।
ওসি বলেন, আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিষয়টি তদন্ত করছি। কে বা কারা এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কাজ করছে এবং হত্যার নেপথ্যে কোনো ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব নাকি সাংবাদিকতা বা রাজনৈতিক শত্রুতা রয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশের রেকর্ড অনুযায়ী, নিহত রানা প্রতাপের বিরুদ্ধে অভয়নগর থানায় একটি এবং কেশবপুর থানায় তিনটি মামলা রয়েছে। তবে মামলাগুলোর প্রকৃতি মাদক, না কি অন্য কোনো অপরাধ সংক্রান্ত ছিল তা পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট করেনি।
ধারণা করা হচ্ছে, তার এই অতীত মামলা বা কোনো পুরনো শত্রুতার জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে।
রানা প্রতাপের মৃত্যুতে যশোরের কেশবপুর এবং মণিরামপুরের সাংবাদিক ও ব্যবসায়ী মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে তার মৃত্যুতে স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং অবিলম্বে খুনিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন অনেকে।
উল্লেখ্য, গত কয়েক দিনে যশোরে এটি দ্বিতীয় বড় ধরনের হত্যাকাণ্ড। মাত্র দুই দিন আগে, ৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে যশোরে জনৈক বিএনপি নেতাকে একইভাবে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। অল্প সময়ের ব্যবধানে একের পর এক রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী খুনের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যশোরের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কি তবে হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে? বিশেষ করে প্রকাশ্যে গুলি করে ও গলা কেটে হত্যার মতো ঘটনা জনমনে এক ধরনের ‘মব জাস্টিস’ বা ভয়ের সংস্কৃতি সৃষ্টি করছে।
রানা প্রতাপ বৈরাগীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড এদেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা অতীত যা-ই হোক না কেন, প্রকাশ্য দিবালোকে একজন সাংবাদিক ও ব্যবসায়ীকে এভাবে হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এলাকাবাসীর দাবি, সিসিটিভি ফুটেজ এবং স্থানীয় সোর্স ব্যবহার করে দ্রুততম সময়ে এই ‘কিলার গ্রুপ’কে আইনের আওয়ায় নিয়ে আসা হোক। অন্যথায়, অপরাধীদের এই দুর্ধর্ষ সাহস সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে পঙ্গু করে দিতে পারে। ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ইএইচ