পটুয়াখালী প্রতিনিধি
জানুয়ারি ৯, ২০২৬, ০৯:৫৭ পিএম
২০১৮ সাল। নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছোট ছোট কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তাল দেশ। সেই আবেগি মুহূর্তের একটি ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করেছিলেন পটুয়াখালীর কলাপাড়ার দক্ষিণ টিয়াখালী (১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুসরাত জাহান সোনিয়া। তিনি জানতেন না, অন্যের একটি পরামর্শমূলক পোস্ট শেয়ার করা তার জীবনে নিয়ে আসবে সাত বছরের এক দীর্ঘ অমাবস্যা।
৪ আগস্ট ২০১৮, মধ্যরাত। যখন গোটা শহর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন নুসরাতের দরজায় কড়া নাড়ে পুলিশ। অপরাধ? তিনি ফেসবুকে একটি পোস্ট শেয়ার করেছিলেন যেখানে শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র সাথে রাখা বা আত্মরক্ষার পরামর্শ ছিল। সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা একজন নারীকে সেই রাতে কলাপাড়া থানায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। থানায় ১২ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয় তাকে, দেওয়া হয়নি পরিবারের সাথে কথা বলার সুযোগ।
নুসরাত বলেন, পা ফুলে গিয়েছিল, মনে হচ্ছিল আমি বুঝি দেশের ভয়ংকরতম কোনো অপরাধী।
পরদিন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের কুখ্যাত ৫৭ (২) ধারায় মামলা দিয়ে তাকে আদালতে পাঠানো হয়। আর ৬ আগস্ট তৎকালীন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. শহীদুল ইসলামের এক চিঠিতে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। শুরু হয় এক অসহায় মায়ের রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে এক অসম লড়াই।
কলাপাড়া থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের পটুয়াখালী জেলা কারাগারে নেওয়ার সময় নুসরাতের সাথে যে আচরণ করা হয়েছিল, তা যেকোনো সভ্য সমাজকে লজ্জিত করবে। নুসরাত যখন মাইক্রোবাসে করে যাচ্ছিলেন, পুলিশ সদস্যরা পুরো পথ জুড়ে হাসি-তামাশা করছিলেন। মাঝপথে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় এসপি কার্যালয়ে। তৎকালীন পুলিশ সুপার তাকে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের নাম বলে জানতে চান তিনি সদস্য কি না। অথচ সাধারণ এক গৃহবধূ ও শিক্ষিকা সেই নামগুলো কোনোদিন শোনেননি।
নুসরাতের বাবা ও স্বামী যখন জেলগেটে অধীর অপেক্ষায়, তখন পুলিশ নুসরাতের বাবার কাছে দাবি করে বসে যে, মেয়েকে ‘আরামে’ আনার বিনিময়ে তাদের মল্লিকা হোটেলে ভূরিভোজ করাতে হবে। সন্তানের চিন্তায় কাতর বাবা বাধ্য হয়ে সেই দাবি মেটান।
সাত মাসের বড় পেট নিয়ে জেলের শক্ত মেঝেতে শুতে হতো নুসরাতকে। পাতলা কম্বলই ছিল তার বিছানা আর বালিশ। সকালে লাল আটার রুটি আর গুড় ছিল বরাদ্দ। গরমে দুপুরের খাবার নষ্ট হয়ে যেত, যা রাতে খাওয়ার অনুপযুক্ত থাকত। এই নিদারুণ কষ্টে ১৪ দিন জেল খাটতে হয়েছিল তাকে। জামিন পেতেও তাকে বেগ পেতে হয়েছে, কারণ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা তার গর্ভাবস্থার মেডিকেল রিপোর্টকে ‘ভুয়া’ বলে দাবি করেছিলেন।
জেল থেকে বের হওয়ার পর নুসরাতের জীবনে শুরু হয় নতুন যন্ত্রণা। এলাকার মানুষ ভয়ে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। পথে বের হলেই কটু মন্তব্য, ‘নিশ্চয়ই ভেতরে কোনো অপরাধ ছিল’ কিংবা ‘জেলের ভেতরে মারধর কেমন হলো?’ মানুষের এই তীক্ষ্ণ চাহনি সইতে না পেরে প্রায় দুই বছর নিজেকে ঘরের চার দেয়ালে বন্দি করে রেখেছিলেন নুসরাত। তার এক স্বাভাবিক জীবন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
নুসরাত যখন কারাগারে, তখন তার বৃদ্ধ বাবার কাছে ফোন আসে। বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেলের চিকিৎসক পরিচয় দিয়ে একজন প্রতারক জানায় নুসরাত অসুস্থ, তাকে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসার জন্য আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা বিকাশ করতে বলা হয়। সৌভাগ্যবশত খোঁজ নিয়ে জানা যায় নুসরাত জেলখানা থেকে কোথাও যাননি। এক অসহায় বাবার অসহায়ত্বকে পুঁজি করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই চেষ্টা প্রমাণ করে নুসরাতের পুরো পরিবারকে কতটা মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
নুসরাতের পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তার স্বামী আনোয়ার হোসেন ও তার পরিবার। বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা দেয় মানবাধিকার সংস্থা ব্লাস্ট। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর গত বছরের ২২ মে হাইকোর্ট নুসরাতকে মামলা থেকে পুরোপুরি অব্যাহতি দেন। আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, যে আইনের ধারায় নুসরাতের বিচার করা হচ্ছিল, তা আগেই বাতিল হয়ে গিয়েছিল। তবুও মামলার চার্জশিট জমা দেওয়া ছিল স্রেফ ‘আইনের অপব্যবহার’।
অবশেষে ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর নুসরাতের বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। দীর্ঘ ৭ বছর ৪ মাস ২৩ দিন পর তিনি পুনরায় নিজ স্কুলে কাজে যোগ দিয়েছেন। জেল থেকে বের হওয়ার তিন মাসের মাথায় জন্ম নেওয়া নুসরাতের ছোট ছেলের বয়স এখন সাত বছর। শিশুটি এখন বুঝতে শিখেছে তার শৈশবের সেই লড়াইয়ের কথা। সে মায়ের কাছে জানতে চায়, মা, আমাকে পেটের ভেতর রেখে কেন তোমাকে পুলিশ ধরে নিয়েছিল? কেন জেল খাটতে হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর নুসরাতের কাছে নেই।
ব্লাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলেন, নুসরাত যা সহ্য করেছেন তা চরম অন্যায়। সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্র তো আছে। রাষ্ট্রকে নুসরাতের এই ক্ষতির জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং যারা এই বেআইনি ঘটনার সাথে জড়িত ছিল, তাদের তদন্ত করে জনসম্মুখে ক্ষমা চাইতে হবে।
নুসরাত এখন তার বকেয়া বেতন ও জব্দ করা ল্যাপটপ-মোবাইল ফিরে পাওয়ার জন্য দৌড়ঝাঁপ করছেন। তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন ঠিকই, কিন্তু তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সাতটি বছর আর গর্ভাবস্থার সেই মানসিক যন্ত্রণা কি রাষ্ট্র ফিরিয়ে দিতে পারবে?
নুসরাত মনে করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তন না হলে হয়তো কোনোদিনই তিনি ন্যায়বিচার পেতেন না।