আমার সংবাদ ডেস্ক
জানুয়ারি ১৭, ২০২৬, ১০:০৩ এএম
শীতের সকালের ঘন কুয়াশা আর গতির উন্মাদনা কেড়ে নিল আরও দুটি তাজা প্রাণ। সিলেটের ওসমানীনগরে ঢাকা সিলেট মহাসড়কে তিনটি যাত্রীবাহী বাসের মধ্যে ভয়াবহ ত্রিমুখী সংঘর্ষে দুই ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।
শনিবার ভোরে ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন যাত্রী।
ঘাতক বাসগুলোর মুখোমুখি ও পার্শ্ববর্তী সংঘর্ষে মহাসড়কের একটি বড় অংশ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। নিহতদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস উদ্ধারকাজ শেষে হতাহতদের হাসপাতালে প্রেরণ করেছে।
মুহূর্তেই লণ্ডভণ্ড তিনটি বাস প্রত্যক্ষদর্শী এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল সাতটার দিকে যখন কুয়াশার চাদরে ঢাকা ছিল মহাসড়ক, ঠিক তখনই ওসমানীনগর এলাকায় এই প্রলয়ঙ্কারী দুর্ঘটনা ঘটে।
সিলেট শহর থেকে রাজধানীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া এনা পরিবহন এবং ইউনিক পরিবহনের দুটি বাসের সাথে গাইবান্ধা থেকে সিলেট অভিমুখে আসা শ্যামলী পরিবহনের একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
সংঘর্ষের নেপথ্যে ওভারটেকিং প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, একটি বাস অন্যটিকে টপকে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা শ্যামলী পরিবহনের সাথে ধাক্কা খায়। এর পরপরই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তৃতীয় বাসটিও এই সংঘর্ষের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে।
বিস্ফোরক শব্দের সাথে সাথে বাসগুলোর সামনের অংশ দুমড়েমুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই দুই যাত্রী মারা যান এবং বাসের ভেতর আটকা পড়েন আরও বেশ কিছু যাত্রী। আর্তনাদ আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে মহাসড়কের ওই এলাকা।
উদ্ধার অভিযান ও হাসপাতালের চিত্র দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই ওসমানীনগর থানা পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধারকাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। বাসের ভেতর আটকা পড়া যাত্রীদের লোহার যন্ত্র দিয়ে কেটে বের করে আনা হয়।
ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা জানান, সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে বাসের চালকের বসার স্থান এবং সামনের আসনগুলো পিষ্ট হয়ে একাকার হয়ে গিয়েছিল। উদ্ধার করা অন্তত ১০ জন আহত যাত্রীকে দ্রুত সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে অন্তত তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রশাসনের বক্তব্য ও বর্তমান পরিস্থিতি দুর্ঘটনার পর মহাসড়কে যান চলাচল সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হলেও পুলিশের দ্রুত হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। ওসমানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনায়েম মিয়া গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা খবর পাওয়ার সাথে সাথে ঘটনাস্থলে বাহিনী পাঠিয়েছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে হতাহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
বর্তমানে ঢাকা সিলেট মহাসড়কে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। তবে নিহতদের পরিচয় উদ্ধারের চেষ্টা চলছে এবং বাসগুলো জব্দ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পুলিশ ধারণা করছে, ভোরের কুয়াশা এবং চালকদের অন্য বাসকে টপকে যাওয়ার প্রবণতাই এই দুর্ঘটনার মূল কারণ।
বিপজ্জনক ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক সিলেট ঢাকা মহাসড়কে প্রায়ই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মহাসড়কটি সরু হওয়া সত্ত্বেও এখানে যানবাহনের গতি থাকে মাত্রাতিরিক্ত। বিশেষ করে এনা, শ্যামলী বা ইউনিক এর মতো দূরপাল্লার বাসগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার মাশুল দিতে হয় সাধারণ যাত্রীদের।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, মহাসড়কের এই অংশে বাঁক থাকলেও চালকরা সেখানে গতি কমান না। বিশেষ করে শীতকালে যখন দৃশ্যমানতা কমে যায়, তখন চালকদের আরও সতর্ক হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা দেখা যায় না।
হাসপাতালে স্বজনদের আহাজারি সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে এখন মানুষের ভিড়। নিহতদের পরিচয় না পাওয়ায় অনেক পরিবারের মধ্যেই আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভোরের আলোয় যারা প্রিয়জনের কাছে পৌঁছানোর স্বপ্ন নিয়ে বাসে চেপেছিলেন, তাদের অনেকের যাত্রাই আজ চিরতরে থেমে গেছে।
নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের স্থানীয় কর্মীরা জানিয়েছেন, মহাসড়কে বেপরোয়া গতির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা না থাকায় এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। আজকের এই তিন বাসের সংঘর্ষ কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি সড়কের অব্যবস্থাপনারই একটি প্রতিচ্ছবি।
জেএইচআর