নিজস্ব প্রতিবেদক, বরগুনা
জানুয়ারি ২৫, ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণায় যখন দেশজুড়ে রাজনৈতিক সৌজন্যবোধের আহ্বান জানানো হচ্ছে, ঠিক তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নিয়ে এক চরম আপত্তিকর ও বিতর্কিত মন্তব্য করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ঝড় তুলেছেন বরগুনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মো. শামীম আহসান।
শনিবার রাতে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাটাখালী এলাকায় আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় তিনি ডাকসু-কে ‘মাদকের আড্ডাখানা’ এবং ‘বেশ্যাখানা’ বলে অভিহিত করেন। তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষ করে ছাত্রসমাজ ও ঢাবির প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে বরগুনা-২ আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী সুলতান আহমেদের সমর্থনে এই জনসভার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শামীম আহসান দলীয় শক্তির মহড়া দিতে গিয়ে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছাত্র সংসদকে লক্ষ্য করে কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করেন।
তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, 'আমরা দেখছি, ডাকসু নির্বাচনের পরে, যে ডাকসু মাদকের আড্ডা ছিল, যে ডাকসু বেশ্যাখানা ছিল, সেটা ইসলামী ছাত্রশিবির পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে।' তিনি আরও দাবি করেন যে, জামায়াতে ইসলামীই দেশ থেকে সকল প্রকার অন্যায়, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি উৎখাত করতে সক্ষম।
শামীম আহসান তাঁর বক্তব্যে রাজনীতিকে ‘আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য’ এবং ‘পরকালের নাজাতের মাধ্যম’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ভোটের মাঠে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তবে তাঁর এই ধর্মীয় বক্তব্যের চেয়ে ডাকসু নিয়ে করা মন্তব্যটিই এখন মূল আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
বক্তব্যের বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা তাঁর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি কিছুটা নমনীয় হওয়ার চেষ্টা করেন। শামীম আহসান দাবি করেন, তিনি বলতে চেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা সমস্যা ছিল এবং ছাত্রশিবির তা সমাধান করেছে। তবে যখন তাকে সরাসরি প্রশ্ন করা হয় যে তিনি ‘বেশ্যাখানা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন কি না, তখন তিনি ‘মোটরসাইকেলে আছেন’ বলে দ্রুত ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
ডাকসুর মতো একটি ঐতিহাসিক এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে এমন মন্তব্যের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী: বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মতে, ডাকসু বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূতিকাগার। এমন প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে ‘বেশ্যাখানা’ শব্দ ব্যবহার করা কেবল অপমানজনক নয়, বরং এটি একটি কুরুচিপূর্ণ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
অন্যান্য রাজনৈতিক দল: বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা বলছেন, ভোটের রাজনীতিতে জামায়াত এখন উগ্রতাকে পুঁজি করছে। এই ধরনের কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য নির্বাচনী পরিবেশকে কলুষিত করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে: নির্বাচন কমিশনের উচিত এই ধরনের উসকানিমূলক ও মানহানিকর বক্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, অন্যথায় নির্বাচনী প্রচারণা কেবল কাদা ছোড়াছুড়িতে পর্যবসিত হবে।
সিইসি যখন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিচ্ছেন, তখন মাঠ পর্যায়ের নেতাদের এমন উসকানিমূলক মন্তব্য স্থানীয় পর্যায়ে উত্তজনা সৃষ্টি করতে পারে। বরগুনা-২ আসনে জামায়াতের এই নেতার বক্তব্য কি নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে সাহায্য করবে, নাকি হিতে বিপরীত হবে তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
গণতন্ত্রের উৎসবে ভাষা ও শব্দের প্রয়োগে সংযম থাকা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে এমন অশালীন মন্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বরগুনার এই ঘটনাটি এখন কেবল স্থানীয় ইস্যু নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে। সচেতন নাগরিক সমাজ আশা করছে, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নেতাদের বক্তব্যের বিষয়ে আরও দায়িত্বশীল হবে।
এএন