চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
ফেব্রুয়ারি ১, ২০২৬, ০১:১৯ পিএম
দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দরে অস্থিরতা কমছে না। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব দুবাই ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'ডিপি ওয়ার্ল্ড'-কে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আজ দ্বিতীয় দিনের মতো কর্মবিরতি পালন করছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। এর ফলে বন্দরের পণ্য খালাস ও অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে অচলাবস্থা সৃষ্টির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
রোববার সকাল ৮টা থেকে শ্রমিকরা একজোট হয়ে কাজ বন্ধ রাখলেও বন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি—পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক এবং অধিকাংশ শ্রমিকই কাজে ফিরেছেন। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। আন্দোলনরত শ্রমিকদের অনড় অবস্থানের কারণে বন্দরের ভেতরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল। দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় ব্যবস্থাপনায় এটি পরিচালিত হয়ে আসলেও সম্প্রতি সরকার এটি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। শ্রমিকদের অভিযোগ, টার্মিনালটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিলে তারা কর্মসংস্থান হারাবেন এবং বন্দরের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হবে। এই দাবির সপক্ষে গতকাল শনিবার টানা ৮ ঘণ্টা কাজ বন্ধ রেখে প্রথম দফায় আন্দোলন শুরু করেন তারা।
বিদ্যমান অস্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) বন্দর এলাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করে একটি জরুরি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। তবে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণাকে এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে শ্রমিকদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা হিসেবে দেখছেন আন্দোলনকারীরা।
আন্দোলন দমাতে কঠোর অবস্থানে গেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দরের শৃঙ্খলা ভঙ্গ এবং কাজে বিঘ্ন ঘটানোর দায়ে চারজন সক্রিয় শ্রমিক নেতাকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কেরানীগঞ্জের পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনালে তাৎক্ষণিক বদলি করা হয়েছে। এছাড়া, শ্রমিকদের কর্মবিরতির ফলে বন্দরের আর্থিক ও বাণিজ্যিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে ৬ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে শ্রমিকরা। আজ বেলা ১১টায় চট্টগ্রামের বাণিজ্যিক এলাকা আগ্রাবাদ থেকে একটি বিশাল 'কালো পতাকা মিছিল' বের করার কথা রয়েছে। শ্রমিক নেতাদের দাবি, বন্দর কর্তৃপক্ষ ভয় দেখিয়ে আন্দোলন দমাতে চাইছে, কিন্তু টার্মিনাল ইজারা বাতিল না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ফিরবেন না।
বন্দরে টানা দ্বিতীয় দিনের কর্মবিরতিতে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে পোশাক খাতের কাঁচামাল সময়মতো খালাস না হলে এবং জাহাজ জট তৈরি হলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
একদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং অন্যদিকে শ্রমিকদের স্বার্থ—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে চট্টগ্রাম বন্দর এখন এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মুখোমুখি। ডিপি ওয়ার্ল্ড ইস্যুতে শেষ পর্যন্ত সরকার পিছু হটে নাকি কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বন্দর স্বাভাবিক করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
এএন