চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৬, ০৬:৫৬ পিএম
নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে দেশের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে ঝড়ের সৃষ্টি করেছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা মহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী।
তিনি জামায়াতে ইসলামীকে ইসলামি আদর্শচ্যুত সংগঠন হিসেবে অভিহিত করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যত জিহাদের ডাক দিয়েছেন। এমনকি ঐতিহাসিক ও আদর্শিক দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল কাদিয়ানি ইস্যুকে টেনে এনে তিনি দাবি করেছেন, কাদিয়ানিদের চেয়েও জামায়াত ইসলামের বেশি ক্ষতি করেছে।
বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কাজীরহাট বড় মাদ্রাসায় খতমে বুখারী উপলক্ষে আয়োজিত এক ধর্মীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। আল্লামা মহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী তার বক্তব্যে সরাসরি জামায়াতে ইসলামীর আকিদা ও রাজনৈতিক দর্শনের কঠোর সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলাম কোনো প্রকৃত ইসলাম নয়। মদিনার ইসলামের যে রূপ ও শিক্ষা, তার সঙ্গে জামায়াতের ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা ইসলামের নামে নিজস্ব এক রাজনৈতিক দর্শন প্রচার করে আসছে, যা বিভ্রান্তিকর।
হেফাজত আমির স্পষ্ট ভাষায় বলেন, জামায়াতের অনুসারী ও সমর্থকদের আচার আচরণ এবং কথাবার্তা ইসলামি শিষ্টাচারের পরিপন্থী। তাই তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া প্রত্যেকটি সচেতন মুসলমানের জন্য ধর্মীয় কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসলামি পরিমণ্ডলে কাদিয়ানিদের বা আহমদিয়া আকিদাগত কারণে চরম বিতর্কিত মনে করা হয়।
কিন্তু বাবুনগরী দাবি করেন, কাদিয়ানিদের দিয়ে ইসলামের যে ক্ষতি হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি গভীর ও সুদূরপ্রসারী ক্ষতি করেছে জামায়াত। তার মতে, জামায়াত ইসলামের মূলধারাকে পাশ কাটিয়ে তরুণ প্রজন্মকে ভুল পথে পরিচালিত করছে।
হেফাজতে ইসলামের রাজনীতিতে সরাসরি অংশগ্রহণের বিষয়ে বরাবরই কড়াকড়ি থাকলেও, ফটিকছড়ির এ সম্মেলন থেকে তিনি রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেন। চট্টগ্রাম-২ বা ফটিকছড়ি আসনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
হেফাজত আমিরের এ সমর্থন ফটিকছড়ির নির্বাচনী সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর মাধ্যমে তিনি তার অনুসারীদের এ নির্দেশ দিলেন যে, তারা যেন জামায়াত সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের বর্জন করে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন।
আল্লামা বাবুনগরী তার অনুসারী ও তাওহিদী জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত সমর্থিত বা জামায়াতের ছায়াতলে থাকা প্রার্থীদের ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে একঘরে করার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদেরকে আসন্ন নির্বাচনে পুরোপুরি বর্জন করতে হবে। তারা যাতে ইসলামের নাম ভাঙিয়ে ক্ষমতার অংশীদার হতে না পারে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি। হেফাজত আমিরের এ বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
জামায়াতের অনুসারীরা এ বক্তব্যকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে জেতানোর কৌশল হিসেবে দেখছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, কওমি ঘরানার শীর্ষ নেতা হিসেবে আল্লামা বাবুনগরীর এ ঘোষণা জামায়াতের ভোটব্যাংকে বড় ধরনের ফাটল ধরাতে পারে, বিশেষ করে চট্টগ্রামের মতো এলাকাগুলোতে যেখানে হেফাজত ও জামায়াত উভয়েরই শক্ত অবস্থান রয়েছে।
নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে দেশের শীর্ষ ওলামাদের পক্ষ থেকে এমন কঠোর বার্তা ভোটের লড়াইয়ে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে। আল্লামা মহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর এ অবস্থান কি শুধুই ধর্মীয় নাকি এর পেছনে গভীর কোনো রাজনৈতিক মেরুকরণ কাজ করছে, তা নিয়ে দেশজুড়ে চলছে সরব আলোচনা।
ইএইচ