পঞ্চগড় প্রতিনিধি
ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬, ০১:০৭ পিএম
পঞ্চগড়-১ আসনের নির্বাচনী লড়াই শেষ হলেও এর রেশ যেন কাটছেই না। ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে পাল্টাপাল্টি হামলা, হুমকি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বাকযুদ্ধের মধ্য দিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে হিমালয় কন্যা পঞ্চগড়ের রাজনীতি। একদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতা সারজিস আলমের অভিযোগ তাঁর নেতা-কর্মীদের ওপর চড়াও হচ্ছে বিজয়ীরা; অন্যদিকে বিএনপির দাবি এসবই সাজানো নাটক এবং অপপ্রচার।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই পঞ্চগড়-১ আসনে শুরু হয়েছে নতুন এক রাজনৈতিক বিতর্ক। নির্বাচনের ফলাফল পরবর্তী সহিংসতাকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং সদ্য আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও এই আসনের পরাজিত প্রার্থী সারজিস আলম অভিযোগ করেছেন, ভোটের পর থেকে তাঁর নেতা-কর্মীদের অন্তত ৩০টি স্থানে হামলা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করা হয়েছে। তবে বিএনপি এই অভিযোগকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করছে।
নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সারজিস আলম তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে একাধিক পোস্টের মাধ্যমে দাবি করেন যে, পঞ্চগড়ের সদর, তেঁতুলিয়া ও আটোয়ারী উপজেলায় তাঁর নির্বাচনী প্রতীক 'শাপলা কলি'র সমর্থকদের বাড়িঘর ও দোকানে হামলা চালানো হচ্ছে। তিনি সরাসরি এই ঘটনার জন্য বিএনপির নেতা-কর্মীদের দায়ী করেছেন। সারজিসের দাবি অনুযায়ী, অনেক জায়গায় নেতা-কর্মীদের দোকান বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হচ্ছে এবং তাঁদের পরিবারকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
সারজিস আলম প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "বিজয়ের আনন্দ যেন কারও ওপর আক্রমণাত্মক না হয়। এখনো হুমকি অব্যাহত আছে। আমরা বিষয়টি বিজয়ী প্রার্থী নওশাদ জমির এবং প্রশাসনকে জানিয়েছি। এরপরও সুরাহা না হলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।'
সারজিস আলমের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তেঁতুলিয়া উপজেলার তিরনইহাট ইউনিয়নের ডাঙ্গাপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন এক চিত্র। সেখানে এনসিপির নারী কর্মী সুচনা আক্তারের বাড়ির টিনের দরজায় কিছু আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। সুচনা আক্তারের দাবি, প্রতিবেশী নূর আলম ওরফে সলিম উদ্দিন তাঁর গায়ে হাত তুলেছেন।
তবে স্থানীয় বাসিন্দা আরজিনা আক্তারের মতে, বিষয়টি যতটা না রাজনৈতিক, তার চেয়ে বেশি পারিবারিক ও আকস্মিক। তিনি জানান, ধানের শীষের মিছিল যাওয়ার সময় অসাবধানতাবশত একজনের ধাক্কায় জানালায় শব্দ হলে দুই পক্ষের মধ্যে ঝগড়া বাধে। উল্লেখ্য, এই দুই পক্ষই একই বংশের এবং একে অপরের প্রতিবেশী।
সদর উপজেলার মীরগড় বাজারে পান দোকানি মিজানুর রহমানের ঘটনাটিও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। মিজানুর জানান, তাঁকে দোকান বন্ধ রাখতে বলা হলেও কোনো মারধর করা হয়নি। স্থানীয় বিএনপি নেতা বদরুজ্জামান দাবি করেন, মিজানুর ভোটের দিন বিএনপির কর্মীদের গালিগালাজ করেছিলেন, তাই অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে তাঁকে সাময়িকভাবে দোকান বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল।
আটোয়ারী উপজেলার গুঞ্জরমারী এলাকায় এনসিপি সমর্থক সাইফুল ইসলামের খড়ির ঘরে আগুন লাগার ঘটনাটি বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সাইফুল ইসলামের দাবি, এটি রাজনৈতিক বিদ্বেষপ্রসূত আগুন। তবে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম দুলাল এটিকে কয়েকদিন আগের একটি সাধারণ অগ্নিকাণ্ড বলে অভিহিত করেছেন।
একই উপজেলার রানীগঞ্জ বাজারে মাছ বিক্রেতা আবদুল ওহাবের চৌকি এবং জামায়াত কর্মী আবদুল কাদেরের পিঠার দোকান ভাঙচুরের ঘটনাটিও আলোচনায় এসেছে। তবে কারা এই ঘটনার সাথে জড়িত, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ মেলেনি।
সারজিস আলমের অভিযোগের জবাবে বিএনপির বিজয়ী প্রার্থী নওশাদ জমিরের নির্বাচনী এজেন্ট নওফল আরশাদ জমির কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, বরং সারজিস আলমের লোকজনই আটোয়ারীতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল এবং বিএনপির রিপন ও মাসুম নামে দুই কর্মীকে আহত করেছে।
নওফল আরশাদ বলেন, 'আমরা ১৭ বছরের প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বের হয়ে আসতে চাই। বিএনপির পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তাকে বহিষ্কার করা হবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সারজিস আলম নিউজ বানিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।'
পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম জানিয়েছেন, জেলার পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত রয়েছে। তিনি বলেন, 'আমরা বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ পাঠিয়েছি। এগুলো মূলত স্থানীয় পর্যায়ে সমর্থকদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি বা ঝগড়া। বড় ধরনের কোনো সহিংসতা বা লিখিত অভিযোগ এখন পর্যন্ত আমরা পাইনি।'
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পঞ্চগড়-১ আসনে সারজিস আলমের উত্থান দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সমীকরণকে নাড়িয়ে দিয়েছে। নির্বাচনে পরাজয়ের পর নিজের জনসমর্থন ধরে রাখা এবং নেতা-কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে সারজিস আলম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় পর ক্ষমতায় ফেরা বিএনপি চাচ্ছে নিজেদের ইমেজ বা ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখতে।
এএন