পাবনা প্রতিনিধি
মার্চ ১, ২০২৬, ০৩:৪৮ পিএম
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে পাবনার ঈশ্বরদীতে ঘটে যাওয়া পৈশাচিক দাদি-নাতনি হত্যাকাণ্ডের রহস্য মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। এই নৃশংস ঘটনার মূল কারিগর আর কেউ নন, নিহতের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ আত্মীয় শরিফুল ইসলাম (২৮)।
রোববার দুপুরে পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজিনুর ইসলাম এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ঘাতক শরিফুল নিহত স্কুলছাত্রী জামিলার আপন কাকা (বাবার খালাতো ভাই) এবং নিহত বৃদ্ধা সুফিয়া খাতুনের আপন বোনের ছেলে।
পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে ঘাতক শরিফুল স্বীকার করেছে যে, সে একাই এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি দিবাগত গভীর রাতে যখন পুরো গ্রাম নিস্তব্ধ, তখন সে প্রাচীর টপকে বাড়িতে প্রবেশ করে। বাড়িতে তখন কোরআনের হাফেজা ও নবম শ্রেণির ছাত্রী জামিলা আক্তার (১৫) এবং তার বৃদ্ধা দাদি সুফিয়া খাতুন (৭০) ঘুমিয়ে ছিলেন।
প্রথমে শরিফুল বৃদ্ধা সুফিয়া খাতুনকে হাতুড়ি ও লোহার রড দিয়ে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে। তার রক্তাক্ত মরদেহ বাড়ির উঠানে ফেলে রাখা হয়।
এরপর সে ঘুমন্ত জামিলাকে মুখ চেপে ধরে পার্শ্ববর্তী একটি নির্জন সরিষা ক্ষেতে নিয়ে যায়। সেখানে কিশোরী জামিলাকে পাশবিক নির্যাতনের (ধর্ষণ) পর বাঁশের খুঁটি ও রড দিয়ে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।
রোববার দুপুরে ঘাতককে সাথে নিয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে সে অত্যন্ত নির্লিপ্তভাবে বর্ণনা দেয়, কীভাবে সে তার নিজের রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়দের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হাতুড়ি, রড এবং একটি রক্তমাখা বাঁশের খুঁটি উদ্ধার করা হয়েছে।
নিহত জামিলার পারিবারিক জীবন ছিল অনেকটা বিষাদময়। স্থানীয়রা জানান, অনেক আগেই জামিলার বাবা জয়নাল খাঁর সাথে তার মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট জামিলা ছোটবেলা থেকেই দাদির আদরে বড় হচ্ছিল। তার বাবা কাজের প্রয়োজনে ঢাকায় অবস্থান করায় বাড়িতে কেবল দাদি আর নাতনিই থাকতেন।
জামিলা শুধু স্থানীয় মাদ্রাসার মেধাবী ছাত্রীই ছিল না, সে কোরআনের হাফেজাও ছিল। তার এমন করুণ পরিণতিতে পুরো ঈশ্বরদী এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনার রাতে স্থানীয়রা কান্নার আওয়াজ শুনে রাস্তায় বের হলেও অন্ধকার ও নিস্তব্ধতার কারণে কিছু বুঝতে না পেরে ফিরে গিয়েছিলেন। সকালে উঠানে সুফিয়া খাতুনের ক্ষতবিক্ষত দেহ এবং সরিষা ক্ষেতে বিবস্ত্র অবস্থায় জামিলার নিথর দেহ পাওয়ার পর এলাকাটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজিনুর ইসলাম জানান, ঘটনার পর থেকেই পুলিশ ছায়া তদন্ত শুরু করে। পারিপার্শ্বিক তথ্য ও সন্দেহের ভিত্তিতে ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালেই শরিফুলকে তার নিজ বাড়ি থেকে আটক করা হয়। নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মুখে সে ভেঙে পড়ে এবং হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা দেয়।
নিহত সুফিয়া খাতুনের মেয়ে মর্জিনা খাতুন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। শরিফুল ইসলামের জবানবন্দি ও উদ্ধারকৃত আলামতের ভিত্তিতে তাকে এই মামলার প্রধান ও একমাত্র আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
একই পরিবারের সদস্যের হাতে এমন পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড আবারও সমাজের নৈতিক অবক্ষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে। যে কাকার কোলে-পিঠে জামিলা বড় হয়েছে, সেই কাকার লালসা ও হিংস্রতার বলি হতে হলো তাকে। আত্মীয়তার পবিত্র সম্পর্ককে কলঙ্কিত করার এই ঘটনায় পাবনাবাসী ঘাতক শরিফুলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এই মামলার নিষ্পত্তির দাবি জানিয়েছেন।
পাবনার ঈশ্বরদীর এই ঘটনা কেবল একটি জোড়া হত্যাকাণ্ড নয়, এটি একটি সম্ভাবনাময় হাফেজা কিশোরীর স্বপ্নভঙ্গের গল্প। পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, চার্জশিট দ্রুত প্রদানের মাধ্যমে ঘাতকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে তারা বদ্ধপরিকর।
এএন