ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন, ২০২৬

বরগুনায় অবৈধ ড্রেজারের দাপটে বিপন্ন বিভিন্ন নদী-খাল 

বেলাল হোসেন মিলন, বরগুনা

বেলাল হোসেন মিলন, বরগুনা

জুন ৬, ২০২৬, ০২:১৭ পিএম

বরগুনায় অবৈধ ড্রেজারের দাপটে বিপন্ন বিভিন্ন নদী-খাল 

বরগুনার আমতলী, তালতলী, বামনা সহ জেলার বিভিন্ন নদী, খাল, বিল, পুকুর ও জলাশয়ে অবৈধভাবে শক্তিশালী ‘বোমা’ মেশিন ও ড্রেজার ব্যবহার করে বালু উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান, জরিমানা ও ড্রেজার জব্দের ঘটনাও থামাতে পারছে না এই অবৈধ কর্মকাণ্ড। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্র পরিবেশ ও জনস্বার্থ উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন ধরে বালু উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে আমতলী ও তালতলীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গভীর রাত থেকে শুরু করে দিনের বিভিন্ন সময় নদী, খাল, বিল, পুকুর এবং আবাদি জমির পাশ থেকে শক্তিশালী ড্রেজার মেশিনের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। উত্তোলিত বালুর একটি বড় অংশ স্থানীয় সড়ক নির্মাণ, ভরাট কাজ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদিত বালুমহাল থেকে বালু সংগ্রহ না করে খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাশয়ের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করে নির্বিচারে বালু উত্তোলন করলে জলাশয়ের তলদেশ অস্বাভাবিকভাবে গভীর হয়ে যায়, পাড় দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভাঙনের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। একই সঙ্গে কৃষিজমির উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি স্থানীয় পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তালতলীর বাসিন্দা হারুন অর রশিদ মোল্লা বলেন, অবৈধ ড্রেজার মেশিন দিয়ে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র পুকুর, খাল ও আবাদি জমি থেকে বালু উত্তোলন করে বিভিন্ন সড়ক নির্মাণকাজে ব্যবহার করছে। সড়ক নির্মাণে বালু সরবরাহের জন্য বাজেটে নির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে স্বল্পমূল্যে অবৈধ উপায়ে বালু সংগ্রহ করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন সড়কের মান ও স্থায়িত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে, অন্যদিকে যেসব স্থান থেকে বালু তোলা হচ্ছে সেগুলো ভবিষ্যতে দেবে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।

আমতলীর কৃষক মো. শাহীন হাওলাদার বলেন, যেখানেই রাস্তার কাজ চলছে, সেখানেই পার্শ্ববর্তী আবাদি জমি, পুকুর, খাল ও বিল থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। কৃষিজমির পাশ থেকে বালু উত্তোলনের কারণে জমি দেবে যাচ্ছে। কয়েক বিঘা জমিতে আগের মতো ফলন হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কৃষকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়বে।

তালতলীর লাউপাড়া গ্রামের গৃহবধূ রেহানা বেগম বলেন, বোমা মেশিনের বিকট শব্দে শিশুদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। দিন-রাত শব্দের কারণে মানুষ মানসিকভাবে বিরক্ত হয়ে পড়ছে। অনেক সময় বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীরাও চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে গেছে।

বরগুনা জেলা নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মনির হোসেন কামাল বলেন, অবৈধ ড্রেজিং শুধু পরিবেশের জন্য নয়, পুরো জনপদের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। কৃষিজমি, বসতবাড়ি, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং জীববৈচিত্র্য- সবকিছুই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। প্রশাসনের অভিযান আরও জোরদার করার পাশাপাশি অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে এর ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে।

সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক বরগুনা জেলা কমিটির সম্পাদক অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা কাদের বলেন, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া কোথাও ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলনের সুযোগ নেই। আইন অনুযায়ী সেতু, কালভার্ট, বাঁধ, গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা ও জনবসতির নিকটবর্তী এলাকায় বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন লঙ্ঘন করে বালু উত্তোলন করলে জরিমানা, কারাদণ্ড এবং ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি জব্দ করার বিধান রয়েছে। কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত না হওয়ায় অসাধু চক্র বারবার একই অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে খাল-বিল ও আবাদি জমির গভীরতা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে পার্শ্ববর্তী জমি ভেঙে পড়ছে, সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন জলাধার এবং জলাবদ্ধতার ঝুঁকি। এছাড়া জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে, কমে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির মাছের সংখ্যা।

পরিবেশ সংশ্লিষ্টদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরে বরগুনার বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। কৃষিজমি হারিয়ে খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে গ্রামীণ অর্থনীতি। একই সঙ্গে বসতভিটা হারিয়ে বহু পরিবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার ফলে বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিতে পারে।

প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অবৈধ ড্রেজার জব্দ, জরিমানা ও কারাদণ্ড প্রদান করলেও এলাকাবাসীর দাবি, স্থায়ীভাবে এই অপতৎপরতা বন্ধে নিয়মিত নজরদারি, কঠোর আইন প্রয়োগ, জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয় সচেতন মহলের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বরগুনার নদী-নির্ভর জনপদগুলোতে কৃষিজমি, বসতভিটা, জলাশয় ও পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। উন্নয়নের নামে চলা এই অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ পরিবেশগত ও মানবিক সংকট অপেক্ষা করছে।

এএন

Link copied!