এমরান হোসেন রাজন, চাঁদপুর
জুন ৩০, ২০২৬, ০৬:৪১ পিএম
বাম্পার ফলনের আশায় নতুন জাতের হাইব্রিড ধান আবাদ করেছিলেন চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার চার গ্রামের কৃষকেরা। বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা তাঁদের একরপ্রতি ১০০ মণ পর্যন্ত ধান উৎপাদনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। সেই আশায় কেউ ঋণ নিয়েছেন, কেউ বা সঞ্চয়ের টাকা খরচ করেছেন। কিন্তু চার মাস পর মাঠে গিয়ে কৃষকেরা দেখছেন ভিন্ন চিত্র সবুজ ধানগাছে শীষ নেই, কোথাও বা শীষ এলেও অধিকাংশেই চিটা। ফলে প্রায় ৭০ একর জমির ধানখেত এখন কৃষকদের জন্য দুঃস্বপ্নের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপজেলার নায়েরগাঁও উত্তর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর, নন্দীখোলা, কাচিয়ারা ও বকচর গ্রামের প্রায় অর্ধশত কৃষক এবার ‘বিএনআর’ নামের একটি হাইব্রিড মোটা ধান আবাদ করেছিলেন। স্থানীয় এক ডিলারের কাছ থেকে প্রতি কেজি বীজ সাড়ে ৫০০ টাকা দরে কিনে বীজতলা তৈরি করেন তাঁরা। পরে নিয়ম মেনে জমিতে চারা রোপণ, সেচ, সার ও কীটনাশক প্রয়োগসহ সব ধরনের পরিচর্যা করেন। কিন্তু ধান পাকার সময় ঘনিয়ে এলেও অধিকাংশ জমিতে শীষ আসেনি। কোথাও কোথাও শীষ এলেও তাতে ধান হয়নি। ফলে কয়েক মাসের শ্রম ও লাখ লাখ টাকার বিনিয়োগ এখন প্রায় পুরোপুরি অনিশ্চয়তার মুখে।
নন্দীখোলা গ্রামের কৃষক আয়েশা বেগম আড়াই একর জমিতে এই ধান আবাদ করেছিলেন। নিজের জমির পাশে দাঁড়িয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘কোম্পানির লোকজন কইছিল, একরে ১০০ মণ ধান হইব। সেই কথা বিশ্বাস কইরা আড়াই একর জমিতে চাষ করছি। যা যা লাগে সব দিছি। চার মাস পার হইয়া গেছে, কিন্তু ধান নাই। এখন আমি কী নিয়া বাঁচমু?’
একই অভিযোগ করেন কৃষক এমরান হোসেন, গোলাম মোস্তফা, জামাল হাজী, রহমান সৈয়াল ও আবুল কালামসহ অন্যরা। তাঁদের ভাষ্য, প্রতি একর জমিতে প্রায় ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছে। কিন্তু ফলনের কোনো আশা নেই। অনেকেরই জমির খরচ উঠবে না, বরং ঋণের বোঝা আরও বাড়বে।
সরেজমিনে কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত মাঠ ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমিতে ধানগাছ দাঁড়িয়ে থাকলেও শীষ প্রায় নেই। কোথাও শীষ থাকলেও অধিকাংশই ফাঁপা। অনেক কৃষক খড় কাটারও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। কারণ খড় কাটতে যে খরচ হবে, তা বিক্রি করে ওঠানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তাঁরা। গোবিন্দপুর গ্রামের এক কৃষক বলেন, ‘ধান তো পাই নাই, এখন খড় কাটলেও লোকসান। কাটার মজুরি দেওয়ার সামর্থ্যও নাই। তাই অনেকেই জমিতে ধানগাছ ফেলে রাখার চিন্তা করছেন।’
কৃষকদের অভিযোগ, বীজ বিক্রির সময় তাঁদের কাছে উচ্চ ফলনের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ফলন বিপর্যয়ের পর এখন তাঁরা দিশেহারা। অনেক পরিবারই কৃষির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এ ক্ষতির প্রভাব পুরো বছরের জীবিকায় পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং কর্মকর্তা ওবায়দুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা ক্ষতিগ্রস্ত জমিগুলো পরিদর্শন করেছি। বিষয়টি নিয়ে কোম্পানি অবগত আছে। মতলবে যেসব জমিতে সমস্যা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোতে আলু উত্তোলনের পর ধানের চারা রোপণ করা হয়েছিল। কেন এমন হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কৃষকদের সঙ্গে আমরা কাজ করি। তাই তাঁদের সহযোগিতার বিষয়ে কোম্পানি অবশ্যই বিবেচনা করবে।’
তবে কৃষকদের প্রশ্ন যদি বীজ বা উৎপাদন ব্যবস্থায় কোনো সমস্যা থেকে থাকে, তাহলে তার দায় কে নেবে? আর যদি কৃষকদের ভুল থাকে, তাহলে আগে কেন তাঁদের যথাযথ পরামর্শ দেওয়া হয়নি?
মতলব দক্ষিণ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা চৈতন্য পাল বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত। কৃষকদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা অপূরণীয়। কোম্পানির কর্মকর্তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। সমস্যার কারণ নির্ণয়ে নমুনা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে বলে তারা জানিয়েছে। কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে কতটুকু ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
এদিকে ফলনহীন মাঠের দিকে তাকিয়ে হতাশ কৃষকেরা। কয়েক মাসের পরিশ্রম, সময় ও অর্থ বিনিয়োগের পর ফসলের পরিবর্তে চিটা ধান দেখে তাঁদের চোখে এখন শুধু অনিশ্চয়তার ছায়া। কৃষকদের দাবি, দ্রুত তদন্ত করে ক্ষতির কারণ নির্ণয় এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হোক। অন্যথায় এই ক্ষতি সামাল দেওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব হবে না।
জেএইচআর