ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Amar Sangbad

ইনস্টাগ্রাম

Amar Sangbad

এক্স

Amar Sangbad


লিংকডইন

Amar Sangbad

পিন্টারেস্ট

Amar Sangbad

গুগল নিউজ

Amar Sangbad


হোয়াটস অ্যাপ

Amar Sangbad

টেলিগ্রাম

Amar Sangbad

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Amar Sangbad


ফিড

Amar Sangbad

ঢাকা শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে পিষ্ট মধ্যবিত্ত, উন্নয়নের আড়ালে এক নিরব হাহাকার

আমার সংবাদ ডেস্ক

আমার সংবাদ ডেস্ক

মে ৬, ২০২৬, ০৬:১৯ পিএম

মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে পিষ্ট মধ্যবিত্ত, উন্নয়নের আড়ালে এক নিরব হাহাকার

বাংলাদেশের অর্থনীতির আকাশে গত কয়েক বছর ধরেই মূল্যস্ফীতির কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। সাধারণ মানুষের নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসারে এখন যোগ হয়েছে নতুন এক আতঙ্ক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি আবারও ৯ শতাংশের ঘর অতিক্রম করে ৯.০৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী হওয়ার এক দালিলিক প্রমাণ। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি এই আগুনের শিখায় ঘৃতাহুতি দিয়েছে, যার ফলে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে দেশের মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষ।

পরিসংখ্যান বলছে, গত মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮.৭১ শতাংশে নেমে আসলেও এপ্রিলে তা আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। গত ছয় মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাঁচ মাসই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের উপরে ছিল। এটি নির্দেশ করে যে, বাজার ব্যবস্থা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় এখন আর সাধারণের নাগালের মধ্যে নেই।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.৩৯ শতাংশ, খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৫৭ শতাংশ এবং জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধি ৮.১৬ শতাংশ। এখানেই লুকিয়ে আছে আসল সংকট। যখন মূল্যস্ফীতি ৯.০৪ শতাংশ কিন্তু মজুরি বৃদ্ধির হার মাত্র ৮.১৬ শতাংশ, তখন মানুষের প্রকৃত আয় বা ক্রয়ক্ষমতা সরাসরি কমে যায়। অর্থাৎ মানুষ আগের চেয়ে বেশি কাজ করেও আগের মতো সমপরিমাণ পণ্য ঘরে তুলতে পারছে না।

গত ১৯ এপ্রিল সরকার জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে। ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩০ টাকা এবং অকটেন ও পেট্রলের দাম যথাক্রমে ১৪০ ও ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। অর্থনীতির সাধারণ সূত্র অনুযায়ী, জ্বালানির দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন ও উৎপাদন খাতে।

পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়ে গেছে। সেচ পাম্প থেকে শুরু করে কারখানার জেনারেটর, সবখানেই জ্বালানি লাগে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়লে ব্যবসায়ীরা সেই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা চাপিয়ে দেন সাধারণ ক্রেতার কাঁধে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো, যারা না পারে লাইনে দাঁড়িয়ে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবির পণ্য নিতে, না পারে উচ্চবিত্তের মতো বিলাসিতা করতে, তারাই এখন দিশেহারা।

মূল্যস্ফীতির এই ঊর্ধ্বগতি মধ্যবিত্তের জীবনযাপনকে চরমভাবে সংকুচিত করে ফেলেছে। একজন বেসরকারি চাকরিজীবী বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর আয় স্থির থাকলেও জীবনযাত্রার প্রতিটি ধাপে তাকে বেশি গুনতে হচ্ছে। মাছ ও মাংসের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় মধ্যবিত্তের পাতে এখন এগুলো বিলাসিতা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে ডাল ভাতের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।

জীবনধারণের ব্যয় মেটাতে গিয়ে পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের শিক্ষা উপকরণ বা প্রাইভেট টিউটরের খরচ কমিয়ে দিচ্ছে। অসুস্থ হলেও অনেকে ডাক্তার দেখানোর চেয়ে ঘরোয়া চিকিৎসায় বা ফার্মেসির ওপর নির্ভর করছেন ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য। মধ্যবিত্তের শক্তির জায়গা ছিল ছোট ছোট সঞ্চয়। বর্তমানে আয়ের চেয়ে ব্যয় বেশি হওয়ায় সঞ্চয় তো দূরের কথা, বরং সঞ্চয়পত্র ভেঙে বা ধারদেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মজুরি বৃদ্ধির হার যখন মূল্যস্ফীতির নিচে থাকে, তখন মানুষ কেবল দরিদ্রই হয় না, মানসিকভাবেও ভেঙে পড়ে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপাত্ত অনুযায়ী, ব্যবধানটা প্রায় ০.৮৮ শতাংশ। শুনতে সামান্য মনে হলেও এটি লাখ লাখ মানুষের মাসিক বাজেটে হাজার হাজার টাকার টান ফেলে। চালের দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও অন্যান্য নিত্যপণ্যের অনিয়ন্ত্রিত দাম মজুরি বৃদ্ধির সুফলকে গিলে খাচ্ছে।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত দুই সপ্তাহে শাকসবজি থেকে শুরু করে সাবান ও টুথপেস্টের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও বেড়েছে। পরিবহন ভাড়ার বাড়তি চাপ যাতায়াত খরচকে অসহনীয় করে তুলেছে। নিম্নবিত্তের জন্য সরকারের কিছু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকলেও মধ্যবিত্তের জন্য নেই কোনো সামাজিক সুরক্ষা জাল। তারা লোকলজ্জার ভয়ে মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারছেন না।

সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, মূল্যস্ফীতির হার কমে যাওয়া মানে জিনিসের দাম কমে যাওয়া। বিষয়টি তেমন নয়। মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ হলো পণ্যমূল্য বৃদ্ধির গতি কিছুটা ধীর হওয়া। কিন্তু দাম আগে যা বেড়েছিল তা সেখানেই থাকছে বা আরও কিছুটা বাড়ছে। অর্থাৎ একবার যে পণ্যের দাম বেড়ে যায়, তা আর আগের অবস্থায় ফিরে আসে না।

এই স্থায়ী উচ্চমূল্য বাজারকে একটি দীর্ঘমেয়াদী সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাজার স্থিতিশীল রাখা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, কেবল জ্বালানি তেলের ওপর দায় চাপিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না। বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং মুদ্রানীতির কঠোর প্রয়োগ প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো বাজার মনিটরিং করা এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যারা দাম বাড়াচ্ছে, তাদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা। জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে পরিবহনে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ন্ত্রণে তদারকি বাড়ানো এবং পরিবহন ভর্তুকি প্রদান করা। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মীদের বেতন মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাড়িয়ে মজুরি সমন্বয় করা প্রয়োজন।

মূল্যস্ফীতি যখন ৯ শতাংশের দেয়াল টপকে যায়, তখন তা কেবল অর্থনীতির সূচক থাকে না, তা হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের চোখের জল। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের প্রবৃদ্ধি হলেও সেই প্রবৃদ্ধির সুফল যদি সাধারণ মানুষের থালায় গিয়ে না পৌঁছায়, তবে সেই উন্নয়নের সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অবান্তর নয়।

মধ্যবিত্ত যদি এই অর্থনৈতিক চাপে পিষ্ট হয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়, তবে সমাজের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। সময় এসেছে নীতিনির্ধারকদের কেবল মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি নয়, বরং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং জীবনমানের দিকেও নজর দেওয়ার। একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রতিটি পরিবারের রান্নাঘরে শান্তি থাকা অপরিহার্য। মূল্যস্ফীতির এই লাগামহীন ঘোড়াকে এখনই থামাতে না পারলে আগামীর অর্থনৈতিক যাত্রা আরও বন্ধুর হতে বাধ্য।

জেএইচআর

Link copied!