আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্চ ২২, ২০২৬, ১০:৫৫ এএম
পবিত্র ঈদুল ফিতরের আনন্দ যখন বিশ্বজুড়ে মুসলিম উম্মাহর ঘরে ঘরে কড়া নাড়ছে, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতার কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছে।
গত শনিবার (২১ মার্চ, ২০২৬) মার্কিন সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, তারা পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালীতে একটি ইরানি অস্ত্র বাঙ্কারে সফল হামলা চালিয়েছে। এমন এক সময়ে এই হামলার ঘটনা ঘটল যখন ইরানের রাজধানী তেহরানসহ সারা দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনা শেষে ঈদুল ফিতরের প্রার্থনায় মশগুল ছিলেন।
শনিবার গভীর রাতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) থেকে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় জানানো হয়, ইরানি ভূখণ্ডে অবস্থিত ওই বাঙ্কারটি আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস পরিবহনে সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, ওই ভূগর্ভস্থ স্থাপনাটিতে এমন সব উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র ও ড্রোন মজুত ছিল, যা দিয়ে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা করা হচ্ছিল।
মার্কিন সামরিক মুখপাত্রের মতে, আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি সরবরাহে কোনো প্রকার বিঘ্ন এড়াতেই এই ‘প্রতিরক্ষামূলক’ হামলা চালানো হয়েছে। উল্লেখ্য যে, বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে তেলের দামের ওপর বিশাল প্রভাব ফেলে।
শনিবার তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে যখন কয়েক হাজার ইরানি মুসলিম ঈদের জামাতে মিলিত হয়েছিলেন, তখনও এই হামলার খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েনি। তবে নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই তেহরানের রাজপথে বিক্ষোভের সুর শোনা যায়। বিশেষ করে শিয়া ধর্মাবলম্বী নারীরা বড় আকারে জমায়েত হয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। এএফপির প্রতিবেদনে দেখা যায়, তেহরানের রাজপথে ইরানি নারীরা মুষ্টিবদ্ধ হাতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন।
তাদের মতে, পবিত্র ঈদের দিনে এই ধরণের উস্কানিমূলক হামলা ইরানের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত এবং মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতির অবমাননা। মসজিদের বাইরে সমবেত জনতা অভিযোগ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র শান্তি চায় না বলেই উৎসবের দিনটিকে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আশঙ্কায় বিষিয়ে তুলছে।
২০২৬ সালের শুরু থেকেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের পারদ দ্রুত ওঠা-নামা করছে। বিশেষ করে পারমাণবিক চুক্তির অচলাবস্থা এবং আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরান প্রক্সি যোদ্ধাদের মাধ্যমে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীতে নৌ-নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে।
অন্যদিকে, ইরান এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, যুক্তরাষ্ট্র অকারণে মধ্যপ্রাচ্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে এই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। শনিবারের এই হামলাকে অনেক বিশ্লেষক দেখছেন একটি সরাসরি সামরিক বার্তা হিসেবে। তেহরান যদি এর পাল্টাপাল্টি কোনো পদক্ষেপ নেয়, তবে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক বড় ধরণের যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন এই হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। যদিও মার্কিন বাহিনী দাবি করেছে যে তারা বাঙ্কারটি ধ্বংস করে হুমকি প্রশমিত করেছে, কিন্তু বাজারের কারবারিরা মনে করছেন, ইরানের পক্ষ থেকে যদি এই জলপথটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তবে ব্যারেল প্রতি তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো, যারা মূলত পারস্য উপসাগরের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল, তারা বর্তমানে গভীর উদ্বেগের সাথে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
এই হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশগুলোও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য না করলেও, তাদের নৌবাহিনীকে উচ্চ সতর্কতায় রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, জাতিসংঘ থেকে উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঈদের দিন এই ধরণের সামরিক পদক্ষেপ কূটনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে কিছুটা চাপে ফেলতে পারে, কারণ এটি মুসলিম বিশ্বের কাছে একটি নেতিবাচক বার্তা পাঠিয়েছে।
ঈদুল ফিতরের আনন্দ যখন তেহরানের আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার কথা ছিল, সেখানে এখন বারুদের গন্ধ আর বিক্ষোভের স্লোগান প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। মার্কিন বাহিনীর এই হামলা কেবল একটি বাঙ্কার ধ্বংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যের এক নতুন সংকেত।
ইরান কি কেবল কূটনৈতিকভাবে এর প্রতিবাদ জানাবে, নাকি হরমুজ প্রণালীতে কোনো পাল্টা পদক্ষেপ নেবে, তা দেখার জন্য এখন বিশ্ব তাকিয়ে আছে আগামী কয়েক দিনের দিকে। যদি উত্তেজনা না কমে, তবে ২০২৬ সালের এই ঈদ মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক নতুন সংকটের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকতে পারে।
জেএইচআর