আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জুন ৩০, ২০২৬, ০৫:৫৭ পিএম
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি আজ মঙ্গলবার নিশ্চিত করেছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার বর্তমানে দোহার রাজধানী কাতারে অবস্থান করছেন।
তবে তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, মার্কিন প্রতিনিধিদের সাথে আজ ইরানি কর্মকর্তাদের কোনো সরাসরি বা উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নির্ধারিত নেই।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, গত সপ্তাহের তীব্র ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর ইরান নিজেই এই বৈঠকের জন্য অনুরোধ করেছে। তবে ইরানের সিনিয়র পরমাণু আলোচনাকারী কাজেম গরিবাবাদী এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটনের সাথে কোনো কারিগরি বা সরাসরি বৈঠকের সূচি চূড়ান্ত হয়নি।
কাতারি মুখপাত্র জানিয়েছেন, মার্কিন দূতরা মূলত মধ্যস্থতাকারীদের সাথে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করছেন এবং আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে পর্যালোচনা করছেন।
মার্কিন-ইরান চুক্তিতে আসলে কী রয়েছে?
দীর্ঘ সংঘাতের পর গত ১৭ই জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি খসড়া সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়, যা মূলত একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি।
এই চুক্তির মূল শর্তাবলি নিচে দেওয়া হলো:
আক্রমণ বন্ধ ও যুদ্ধবিরতি: উভয় পক্ষ একে অপরের ওপর সরাসরি সামরিক হামলা বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছে। ইরান তাদের মজুতকৃত উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব কমিয়ে আনতে রাজি হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী উন্মুক্তকরণ: বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ 'হরমুজ প্রণালী' বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। কাতার ও ওমান যৌথভাবে এই জলপথের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ করছে।
৬-বিলিয়ন ডলারের তহবিল: যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের কারণে আটকে থাকা ইরানের ১২ বিলিয়ন ডলারের তহবিলের মধ্যে প্রথম দফায় ৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়করণের বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে কাতার জানিয়েছে, এই অর্থ এখনো তেহরানের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি এবং এটি সম্পূর্ণভাবে আলোচনার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করছে।
এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিটি মূলত ৬০ দিনের একটি কূটনৈতিক উইন্ডো বা সময় তৈরি করেছে, যার মধ্যে সুইজারল্যান্ড বা কাতারে দুই দেশের কারিগরি কমিটি পরমাণু কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিয়ে আলোচনা করবে।
ইসরায়েল কি এই চুক্তি নস্যাৎ করতে পারে?
এই চুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার নাম ইসরায়েল। ২৮শে ফেব্রুয়ারি যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর 'অপারেশন এপিক ফিউরি' (মার্কিন কোডনেম) এবং 'অপারেশন রোরিং লায়ন' (ইসরায়েলি কোডনেম) শুরু করে, তখন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পরমাণু অবকাঠামো ধ্বংস করা এবং তেহরানের শাসনব্যবস্থায় বড় ধাক্কা দেওয়া। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন।
বর্তমানে ওয়াশিংটন যখন তেহরানের সাথে একটি কূটনৈতিক চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে, তখন ইসরায়েল এই চুক্তিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি মনে করছে।
ইসরায়েল গত কয়েকদিন ধরে লেবাননে হিজবুল্লাহর অবকাঠামোতে অনবরত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, লেবাননের স্থিতিশীলতা এই সামগ্রিক চুক্তির একটি অন্যতম অংশ। ফলে ইসরায়েল যদি লেবাননে বড় ধরনের সংঘাত উসকে দেয়, তবে ইরান চুক্তি থেকে সরে আসতে বাধ্য হতে পারে।
ইরানের অভ্যন্তরে পরমাণু কেন্দ্রগুলোতে গোপন সাইবার হামলা কিংবা গুপ্তহত্যার মাধ্যমে ইসরায়েল এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, যা ইরানকে আবারও প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বাধ্য করবে। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের চলমান যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়বে।
'বডিজ অব এভিডেন্স' বা যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি
গত চার মাসের এই ভয়াবহ যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি সম্পূর্ণ ওলটপালট হয়ে গেছে। উইকিপিডিয়া ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সংগৃহীত তথ্যানুযায়ী, এই যুদ্ধের মানবিক ও সামরিক ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান শিউরে ওঠার মতো,
মানবক্ষয় ও বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু
মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের ভেতর সামরিক ও বেসামরিক মিলিয়ে অন্তত ৩,৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং ২৬,৫০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছে। এর মধ্যে গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি বন্দর আব্বাসের কাছে মিনাবের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে প্রায় ১৭০ জন স্কুলছাত্রী নিহত হয়, যা বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় তোলে।
ইরানের পাল্টা ক্লাস্টার (গুচ্ছ) বোমাবাহী ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের অভ্যন্তরে ২৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৪,০০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছে। তেল আবিব এবং জেরুজালেমের বেশ কিছু ধর্মীয় ও প্রাচীন স্থাপনা এই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
লেবাননের হিজবুল্লাহর অন্তত ২,৫০০ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছে। এছাড়া কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে বেশ কিছু বেসামরিক নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছে।
যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (IEA) প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বাজারে ছাড়ে। এই যুদ্ধের কারণে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সরাসরি খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার, এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কংগ্রেসের কাছে আরও ৮৭ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত যুদ্ধ তহবিলের আবেদন করেছেন।
ইরানের অভ্যন্তরে নতুন অস্থিরতা
চলমান আন্তর্জাতিক সংকটের মধ্যেই ইরানের ভেতরে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় 'পশ্চিম আজারবাইজান' প্রদেশে ইসলামি রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস একটি সশস্ত্র 'সন্ত্রাসী-বিচ্ছিন্নতাবাদী' গোষ্ঠীর আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েছে।
মাহাবাদ ও পিরানশাহরের পাহাড়ি এলাকায় ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে চালানো এই অভিযানে ওই সশস্ত্র গোষ্ঠীর ৪ জন সদস্য নিহত হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও যুদ্ধ সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধের ধকলের কারণে ইরানের অর্থনীতি যখন বিপর্যস্ত, তখন এই ধরনের অভ্যন্তরীণ জাতিগত বা বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র তৎপরতা তেহরানের জন্য নতুন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চুক্তির ভবিষ্যৎ ও একটি হটলাইন
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে আকস্মিক গোলাগুলি ও ড্রোন হামলা হয়েছিল, তা মূলত একটি বিশেষ ডি-এস্কেলেশন হটলাইন' ব্যবহারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। যদি এই হটলাইনটি সময়মতো কাজ না করত, তবে ১৭ই জুনের প্রাথমিক চুক্তিটি তখনই ভেস্তে যেত।
আপাতত দোহায় মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের সরাসরি কোনো আলোচনার টেবিল তৈরি না হলেও, কাতার এবং ওমানের মতো মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য তথা সমগ্র বিশ্ব এখন দোহার এই কূটনৈতিক তৎপরতার দিকে তাকিয়ে আছে- ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কূটনীতির মাধ্যমে ইরানের পরমাণু সংকটের সমাধান করতে পারে, নাকি ইসরায়েলের অনমনীয় সামরিক অবস্থানের কারণে মধ্যপ্রাচ্য আরও বড় কোনো আঞ্চলিক মহাযুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এএন