রুহেল হাশেমী
অক্টোবর ২৬, ২০২৫, ০৫:১২ পিএম
থাইরয়েড- শরীরের এক ছোট্ট কিন্তু অতি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি। গলার নিচে, অ্যাডামস অ্যাপল বা স্বরযন্ত্রের নিচে প্রজাপতির মতো আকৃতির এই গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোনই নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের বিপাকক্রিয়া, ওজন, শক্তি, ঘুম, এমনকি মানসিক অবস্থা পর্যন্ত। অথচ এই ক্ষুদ্র অঙ্গটির অসামঞ্জস্যই আজ লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনকে নীরবে জটিল করে তুলছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অসামঞ্জস্যের নাম থাইরয়েড রোগ-কখনো এটি অতিসক্রিয় (হাইপারথাইরয়েডিজম), কখনো কম সক্রিয় (হাইপোথাইরয়েডিজম) হয়।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে থাইরয়েডজনিত সমস্যার প্রবণতা বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। শহরাঞ্চলে কর্মব্যস্ত নারী-পুরুষদের মধ্যে এবং গ্রামীণ অঞ্চলে আয়োডিন ঘাটতিজনিত কারণে এই রোগ এখন খুবই সাধারণ।
থাইরয়েড গ্রন্থি মূলত থাইরোক্সিন (T4) ও ট্রাই-আইডো-থাইরোনিন (T3) নামে দুটি প্রধান হরমোন নিঃসরণ করে। এই হরমোন শরীরের বিপাকক্রিয়া (Metabolism) নিয়ন্ত্রণ করে, অর্থাৎ আমরা কতটা শক্তি খরচ করব, শরীরের তাপমাত্রা কেমন থাকবে, হৃদস্পন্দন ও ওজন কেমন হবে, সবকিছুর সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক।
যখন থাইরয়েড হরমোন অতিরিক্ত উৎপাদন করে, তখন তাকে বলা হয় হাইপারথাইরয়েডিজম। এর ফলে ওজন কমে যায়, ঘুম কম হয়, উদ্বেগ বাড়ে, হাত কাঁপে, হার্টবিট দ্রুত হয়। আবার হরমোন কম উৎপাদন করলে, সেটি হয় হাইপোথাইরয়েডিজম, যার ফলে শরীরের কাজ ধীর হয়ে যায়-ওজন বাড়ে, ক্লান্তি আসে, ত্বক শুষ্ক হয়, মনোযোগ কমে যায়।
থাইরয়েডের সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণগুলো অনেক সময় অন্য রোগের সঙ্গে মিলে যায়। ফলে মানুষ প্রায়ই তা উপেক্ষা করে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—
হাইপোথাইরয়েডিজমে: অকারণে ওজন বৃদ্ধি, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা ঘুম ঘুম ভাব, চুল পড়া ও ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া, বিষণ্ণতা বা মন খারাপ, কোষ্ঠকাঠিন্য, মাসিক অনিয়ম।
হাইপারথাইরয়েডিজমে: হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, হাত কাঁপা, ঘাম বেশি হওয়া, ঘুমে সমস্যা, চোখ ফুলে যাওয়া বা চোখের পাতার পরিবর্তন।
এই লক্ষণগুলির যেকোনোটি দেখা দিলে দেরি না করে এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
রোগ নির্ণয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হলো রক্ত পরীক্ষা। সাধারণত তিনটি মান দেখা হয়
এই মানগুলো দেখে চিকিৎসক বুঝতে পারেন গ্রন্থিটি স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে কি না। প্রয়োজনে আলট্রাসনোগ্রাম বা স্ক্যানিং করেও থাইরয়েড নোডিউল বা টিউমারের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়।
থাইরয়েড রোগে আক্রান্তদের জীবনযাপনে কিছু নিয়ম মানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে ওষুধের প্রয়োজনীয়তা কমে আসে, শরীরও সুস্থ থাকে।
আয়োডিনসমৃদ্ধ খাবার খান: সামুদ্রিক মাছ, ডিম, দুধ, আয়োডিনযুক্ত লবণ ইত্যাদি। আর অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনি ও লবণ এড়িয়ে চলুন।
সয়া জাতীয় খাবার, যেমন সয়া দুধ বা টোফু, অতিরিক্ত না খাওয়াই ভালো, কারণ এটি থাইরয়েড হরমোনের শোষণ বাধাগ্রস্ত করতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান ও ফলমূল-সবজি খাওয়া উচিত।
ওষুধ সেবনের নিয়ম: সকালে খালি পেটে, খাবারের অন্তত ৩০ মিনিট আগে লেভোথাইরক্সিন জাতীয় ওষুধ খেতে হয়। ক্যালসিয়াম বা আয়রন সাপ্লিমেন্ট একসঙ্গে না খাওয়াই ভালো। আর ওষুধ কখনও নিজের ইচ্ছায় বন্ধ করা যাবে না; চিকিৎসকের পরামর্শেই ডোজ পরিবর্তন করতে হবে।
ব্যায়াম ও বিশ্রাম: নিয়মিত হালকা ব্যায়াম যেমন হাঁটা, যোগব্যায়াম, মেডিটেশন মানসিক প্রশান্তি ও হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে। আর পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি; ঘুমের অভাব থাইরয়েড হরমোনের অস্বাভাবিকতা বাড়াতে পারে।
চিকিৎসা: থাইরয়েডের চিকিৎসা নির্ভর করে কোন ধরণের সমস্যা হয়েছে তার ওপর।
হাইপোথাইরয়েডিজমে: লেভোথাইরক্সিন নামের কৃত্রিম হরমোন সেবন করতে হয়।
হাইপারথাইরয়েডিজমে: হরমোন উৎপাদন কমাতে বিশেষ ওষুধ, কখনও রেডিও-আয়োডিন থেরাপি বা সার্জারি প্রয়োজন হতে পারে।
থাইরয়েড নোডিউল বা টিউমার: যদি ম্যালিগন্যান্ট সন্দেহ হয়, তখন অস্ত্রোপচারই একমাত্র উপায়।
চিকিৎসার মূল উদ্দেশ্য হলো শরীরে হরমোনের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. শামীম আরা বলেন, থাইরয়েড রোগ একবার ধরা পড়লে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এটি নিয়মিত ওষুধ ও জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। অনেকেই চিকিৎসা বন্ধ করে দেন, এতে হরমোন আবার ভারসাম্য হারায় এবং জটিলতা দেখা দেয়। তাই রোগ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় নিয়ম হলো নিয়মিত পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা।
নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি থাইরয়েড সমস্যায় ভোগেন। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা মা ও শিশুর উভয়ের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। এতে গর্ভপাত, প্রি-ম্যাচিউর ডেলিভারি বা নবজাতকের বুদ্ধি বিকাশে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই গর্ভধারণের আগে ও পরে থাইরয়েড টেস্ট করানো অত্যন্ত জরুরি।
মানসিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ: থাইরয়েডের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের যোগসূত্র গভীর। হরমোনের পরিবর্তনে অনেকের মধ্যে উদ্বেগ, মনোযোগের অভাব, এমনকি বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে। এজন্য পরিবারের সহানুভূতি, সঠিক পরামর্শ ও মানসিক সমর্থনও রোগ নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে।
থাইরয়েড মানার প্রধান নিয়মাবলি সংক্ষেপে: নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন, ছয় মাস অন্তর রক্ত পরীক্ষা (TSH, T3, T4),পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখা, আয়োডিনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, অ্যালকোহল ও ধূমপান থেকে দূরে থাকা, শারীরিক ব্যায়াম ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, গর্ভধারণের আগে থাইরয়েড পরীক্ষা করা, নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ না করা।
থাইরয়েড কোনো ভয়ংকর রোগ নয়, বরং এটি একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য শারীরিক অবস্থা। নিয়মিত চিকিৎসা, সচেতন খাদ্যাভ্যাস ও সুশৃঙ্খল জীবনযাপনই এই রোগের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধ।
সঠিক তথ্য জানা ও নিয়ম মেনে চলাই পারে মানুষকে এই নীরব শত্রুর হাত থেকে নিরাপদ রাখতে।
জেএইচআর