নিজস্ব প্রতিবেদক
জুন ১১, ২০২৬, ০৪:৩৪ পিএম
রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স চূড়ান্তভাবে বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত ২৭ মে হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় গঠিত উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
বৃহস্পতিবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষ থেকে হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক ও স্বত্বাধিকারী শেখ মহিউদ্দীন বরাবর পাঠানো এক দাপ্তরিক পত্রে লাইসেন্স বাতিলের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এই ঘটনার পর বেসরকারি চিকিৎসাসেবা খাতের নিরাপত্তা ও তদারকি নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে তুমুল আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ২৭ মে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে ছয়টি নবজাতকের আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি গণমাধ্যমে আসার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ, ১৯৮২’-এর ১১(১) ধারা অনুযায়ী একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
তদন্ত কমিটির জমাদানকৃত প্রতিবেদনে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও পোস্ট-অপারেটিভ ব্যবস্থার গুরুতর গাফিলতি, অবহেলা এবং অব্যবস্থাপনার প্রমাণ পাওয়া যায়। এই প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে গত ৪ জুন আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে একটি শোকজ বা কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়। সেখানে জানতে চাওয়া হয়েছিল- গুরুতর অবহেলার দায়ে ‘হাসপাতালটির লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না?’
প্রাথমিকভাবে নোটিশের জবাব দেওয়ার জন্য ৭ জুন বিকেল ৫টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল অধিদপ্তর। তবে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লিখিত জবাব প্রস্তুতের জন্য অতিরিক্ত সময় চেয়ে আবেদন করলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সেই সময়সীমা ৯ জুন বিকেল ৫টা পর্যন্ত বর্ধিত করে।
আজকের পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত ৯ জুন আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পক্ষ থেকে যে লিখিত ব্যাখ্যা ও আত্মপক্ষ সমর্থনের জবাব দেওয়া হয়েছে, তা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে মোটেও সন্তোষজনক বা গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। ফলে জনস্বার্থ ও চিকিৎসায় চরম অবহেলার দায়ে ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ, ১৯৮২’-এর ১১(২) (খ) ধারা মোতাবেক হাসপাতালটির লাইসেন্স সম্পূর্ণভাবে বাতিল ঘোষণা করা হলো।
একটি সুপরিচিত এবং বৃহৎ বেসরকারি হাসপাতালে হঠাৎ লাইসেন্স বাতিলের এমন কঠোর সিদ্ধান্ত আসার পর সেখানে চিকিৎসাধীন শত শত সাধারণ রোগীর নিরাপত্তা ও চিকিৎসা সেবা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে আইসিইউ, সিসিইউ এবং সাধারণ ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা রোগীদের স্বজনরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
এই জরুরি পরিস্থিতিতে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা রোগীদের ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমকে বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, আইনগতভাবে লাইসেন্সবিহীন কোনো হাসপাতালে কোনো নাগরিকের চিকিৎসা নেওয়া উচিত নয় এবং তা নিরাপদও নয়। যে সমস্ত রোগী এই মুহূর্তে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন, তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জরুরি অনুরোধ জানিয়েছি। তারা যেন অনতিবিলম্বে এই রোগীদের নিকটস্থ অন্য কোনো উপযুক্ত এবং মানসম্মত হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করেন।
মহাপরিচালক আরও আশ্বস্ত করে বলেন, রোগী স্থানান্তর বা জরুরি চিকিৎসাসেবা সচল রাখার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর যদি কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা কারিগরি সহায়তার প্রয়োজন হয়, তবে তারা যেন সরাসরি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাথে যোগাযোগ করেন। অধিদপ্তর সব ধরনের লজিস্টিক সাপোর্ট দিতে প্রস্তুত রয়েছে।
লাইসেন্স বাতিল করা হলেও দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সামনে এখনো আইনি লড়াইয়ের একটি পথ খোলা রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৯৮২ সালের সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশের ১২ ধারা মোতাবেক এই আদেশ জারির পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী চাইলে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরকারের (স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়) কাছে আপিল বা পুনর্বিবেচনার আবেদন পেশ করতে পারবেন।
চিকিৎসা খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ খুব দ্রুতই এই আদেশের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে আপিল আবেদন জমা দেবে। তবে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত হাসপাতালটির স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা অবৈধ বলে গণ্য হবে। খবরের ভেতরের খবর,কেন এই বিপর্যয়?
মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালটি বিশেষ করে প্রসূতি ও নবজাতকদের স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু গত ২৭ মে’র ঘটনাটি এই প্রতিষ্ঠানের পুরো ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ করে দেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওই দিন পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে চিকিৎসাধীন ছয়টি নবজাতক প্রায় একই সময়ে মারা যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে স্বাভাবিক বা দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও, তদন্তে বেরিয়ে আসে যে ওই কক্ষের সেন্ট্রাল অক্সিজেন সাপ্লাই বা লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমে কারিগরি ত্রুটি ছিল। অথবা সেখানে নিয়োজিত চিকিৎসাকর্মীদের দায়িত্বে চরম অবহেলা ছিল, যার কারণে চোখের পলকে ছয়টি তাজা প্রাণ ঝরে যায়।
নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এবং যথাযথ ব্যাকআপ ব্যবস্থা না রেখে এমন সংবেদনশীল একটি ইউনিট পরিচালনা করাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ‘ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করেছে।
এমন একটি বড় হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের ঘটনা বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতে একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা বা 'ওয়েক-আপ কল' হিসেবে দেখছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ নাগরিকদের মতে, নামী-দামী হাসপাতালগুলো প্রতিনিয়ত সেবার নামে মোটা অঙ্কের টাকা নিলেও রোগীদের নিরাপত্তার দিকে তাদের নজর থাকে খুবই কম। নবজাতকদের মৃত্যুর মতো সংবেদনশীল ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এই কঠোর অবস্থানকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
তবে একই সাথে মগবাজারের মতো একটি জনাকীর্ণ এলাকায় হুট করে এত বড় একটি হাসপাতালের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গরিব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির রোগীরা সাময়িকভাবে বিপাকে পড়বেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের উচিত দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই হাসপাতালের বিকল্প হিসেবে সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যা ও চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানো, যাতে আদ্-দ্বীন বন্ধ হওয়ার কারণে কোনো রোগী যেন চিকিৎসা না পেয়ে মারা না যান।
এখন দেখার বিষয়, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে শেখ মহিউদ্দীন ও তার প্রতিষ্ঠান আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সরকারের কাছে আপিল করে তাদের লাইসেন্স ফেরত পেতে সক্ষম হয় কিনা, নাকি এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আদ্-দ্বীনের মগবাজার শাখার অধ্যায়ের চিরসমাপ্তি ঘটে।
এএন