শাহিনুর রহমান, ঢাকা
এপ্রিল ১০, ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম
বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তীব্র মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর, যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি, ডলার সংকট এবং মূল্যস্ফীতির চাপ-সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি কতটা ঝুঁকিতে, তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তেলের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদনকারী অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত দাম বেড়ে যায়। এতে পরিবহন, শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও চাপ সৃষ্টি হয়।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত মূলত আমদানিনির্ভর হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেই এর প্রভাব সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে পড়ে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, যা সামগ্রিক খাতে চাপ সৃষ্টি করে।
একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়, ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে গেলে আমদানি ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
যদিও রেমিট্যান্স ও রপ্তানি খাত কিছুটা সহায়তা করে, তবুও দীর্ঘমেয়াদে চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের অর্থনীতিতে ধাপে ধাপে প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে (৩-৬ মাস) জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে, যা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াবে। মধ্যমেয়াদে (৬-১২ মাস) ডলার সংকট তীব্র আকার ধারণ করতে পারে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
এতে আমদানি ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদে (১-২ বছর) পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শিল্প উৎপাদনে ধীরগতি এবং কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বর্তমান সংকট মোকাবেলায় জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি, বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী রাখা ও রপ্তানি খাত সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দিতে হবে।
জ্বালানি বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় কিছুটা দাম বেড়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করছে। জাহাজ সময়মতো না আসা, সরবরাহকারীদের অনাগ্রহ এবং উচ্চ দামে বিকল্প জ্বালানি কেনার কারণে এক মাসেই প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার লোকসান হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা যায়, যুদ্ধ শুরুর পর কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকায় খোলাবাজার থেকে দ্বিগুণ দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। আগে যেখানে প্রতি ইউনিট এলএনজির দাম ছিল প্রায় ১০ ডলার, বর্তমানে তা ২০ থেকে ২৮ ডলারে পৌঁছেছে।
এদিকে এলএনজির দাম দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ভিত্তিতে তিন মাসের গড় অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। ফলে বর্তমানে দাম কমলেও এর সুফল পেতে জুন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কম দামে এলএনজি কেনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধবিরতির পর এক জাহাজ এলএনজি ১৭.৯৯ ডলারে কেনার দর পাওয়া গেছে। এভাবে আটটি কার্গো কম দামে কেনা গেলে প্রায় ১ হাজার ৩২০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।
বর্তমানে পেট্রোবাংলার ঘাটতি প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা। জ্বালানি তেল খাতেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন লাভে থাকা বিপিসি এখন লোকসানের মুখে পড়েছে।
মার্চে ডিজেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৮৬ ডলার থাকলেও এপ্রিলে তা বেড়ে ২৮৪ ডলারে ওঠে, পরে কিছুটা কমে ১৯০ ডলারে নেমে আসে। তবে বাজার এখনও স্থিতিশীল হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে সরবরাহ বাড়বে এবং দাম কমতে পারে। তবে আগের অবস্থায় ফিরতে সময় লাগবে। এই সময় জ্বালানি আমদানিতে অতিরিক্ত ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ডলার ব্যয় হতে পারে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে।
বিশ্ব পরিস্থিতির প্রভাবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়লেও তাৎক্ষণিক বড় ধরনের ধসের আশঙ্কা কম। তবে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও তেল সংকট অব্যাহত থাকলে অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই সময়োপযোগী নীতি গ্রহণ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনাই হতে পারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি।
জেএইচআর