ধর্ম ও জীবন ডেস্ক
অক্টোবর ৩০, ২০২৫, ১১:৫১ এএম
মানুষের জীবনের মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাস। যার বিশ্বাস সঠিক, তার জীবন সঠিক পথে পরিচালিত হয়। ইসলাম ধর্মে এই বিশ্বাসকেই বলা হয় ‘ঈমান’। ঈমানই হলো ইসলামের প্রাণ, একজন মুসলমানের হৃদয় ও কর্মের চালিকাশক্তি। ঈমান ছাড়া কোনো ইবাদত, কোনো নেক কাজই আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই ঈমানের সঠিক ধারণা ও তার যথার্থ ব্যাখ্যা জানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।
‘ঈমান’ শব্দটি আরবি “আমানা” মূলধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ বিশ্বাস করা, নিরাপদ রাখা, স্বীকৃতি প্রদান করা। পরিভাষায় ঈমান বলতে বোঝায় আল্লাহ তাআলার একত্বে, নবী-রাসূলগণের সত্যতায়, আখিরাতের জীবনে, ফেরেশতাদের অস্তিত্বে, কিতাবসমূহে এবং তাকদিরে (ভাগ্যে) দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা ও অন্তর দিয়ে তা মেনে নেওয়া। অর্থাৎ, ঈমান হলো এমন এক দৃঢ় অন্তরের বিশ্বাস, যা মুখে স্বীকার এবং কর্মে প্রকাশ পায়। কেবল মুখের স্বীকারোক্তিই ঈমান নয়; অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস ও কর্মের প্রতিফলনই প্রকৃত ঈমানের পরিচয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “তুমি ঈমান এনেছ এই বলে যে, তুমি আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাগণের উপর, তাঁর কিতাবসমূহের উপর, তাঁর রাসূলদের উপর, পরকালের উপর এবং ভাগ্যের উপর বিশ্বাস রাখো।” (সহিহ মুসলিম)
এই হাদিসে ঈমানের ছয়টি মৌলিক উপাদান উল্লেখ করা হয়েছে। সংক্ষেপে তা হলো— (১) আল্লাহর প্রতি ঈমান: আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়। তিনি সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রক।
(২) ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান: তারা আল্লাহর সৃষ্টি, আলোর দ্বারা সৃষ্টি, যারা আল্লাহর আদেশে নিরলসভাবে কাজ করে।
(৩) কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান: আল্লাহ তাঁর বান্দাদের হেদায়েতের জন্য কিতাব নাজিল করেছেন তাওরাত, যাবুর, ইঞ্জিল ও সর্বশেষ আল-কুরআন।
(৪) নবী-রাসূলদের প্রতি ঈমান: তাঁরা আল্লাহর প্রেরিত দূত, যারা মানুষকে সৎপথে পরিচালিত করেছেন।
(৫) পরকাল বা আখিরাতের প্রতি ঈমান: মৃত্যুর পর মানুষের পুনরুত্থান ঘটবে, এবং তার আমল অনুযায়ী বিচার হবে।
(৬) তাকদিরের প্রতি ঈমান: সব কিছু আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্ধারণে ঘটে—ভালো-মন্দ উভয়ই তাঁর জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত।
ঈমান ছাড়া ইসলাম পূর্ণ হয় না। কুরআনে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তি ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সূরা নিসা: ১২২) ঈমানই মানুষকে অন্যায়, অন্যায্যতা, ভয় ও হতাশা থেকে মুক্ত রাখে। একজন মুমিন সব অবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে, তাঁর বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে। ঈমানের আলোয় আলোকিত মানুষ কষ্টেও ধৈর্যধারণ করে, সুখেও বিনয়ী থাকে।
প্রকৃত ঈমান কেবল মুখের কথা নয়; তা প্রকাশ পায় কাজের মাধ্যমে। একজন সত্যিকারের মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো নামাজ, রোযা, যাকাত ও হজসহ সকল ফরজ পালন করা; মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার করা; প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা; অন্যায় ও পাপ থেকে দূরে থাকা; এবং সব সময় আল্লাহভীতিতে জীবনযাপন করা। কুরআনে বলা হয়েছে “মুমিন তো তারা, যাদের হৃদয় আল্লাহর স্মরণে ভীত হয়, এবং যখন তাঁদের সামনে কুরআন পাঠ করা হয়, তাঁদের ঈমান আরও বৃদ্ধি পায়।” (সূরা আনফাল: ২)
ঈমানের ফল হলো আত্মিক শান্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। যে ব্যক্তি দৃঢ় ঈমান রাখে, আল্লাহ তার অন্তরে প্রশান্তি দান করেন। ঈমানই মানুষকে দুনিয়ার ভয়াবহতা ও বিপদ থেকে রক্ষা করে, আর আখিরাতে জান্নাতের মর্যাদায় পৌঁছে দেয়।
যেমন ঈমান অর্জন করা জরুরি, তেমনি তা সংরক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। কুফরি, শিরক, মুনাফিকি, আল্লাহর আদেশ অমান্য করা ও অন্যের অধিকার হরণ—এগুলো ঈমান নষ্ট করে। ঈমান রক্ষার জন্য প্রয়োজন কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা এবং নিয়মিত আত্মসমালোচনা।
ঈমান শুধু একটি ধর্মীয় শব্দ নয়; এটি মানুষের জীবনধারার ভিত্তি, নৈতিকতার মূল ও মুক্তির পথ। একজন মুমিনের জন্য ঈমান হলো আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, ভয়, আশা ও আনুগত্যের এক অনন্য সমন্বয়। তাই আমাদের উচিত প্রতিনিয়ত নিজের ঈমানকে নবায়ন করা, আল্লাহর স্মরণে জীবন গড়ে তোলা এবং ইসলামের নির্দেশ অনুযায়ী চলা। কারণ, “যে ব্যক্তি ঈমান নিয়ে মারা যায়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সহিহ বুখারি)
লেখক: কলামিস্ট ও সাংবাদিক
ইএইচ